শবে বরাতের তাৎপর্য ও করণীয়

শবে বরাতের তাৎপর্য ও করণীয়

ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, শয়তানের কুমন্ত্রণায় বা নফসের তাড়নায় মানুষ বিপথগামী হয় বা পাপাচারে লিপ্ত হয়। মানুষের পাপের শাপমোচনের জন্য আল্লাহ তাআলা তওবা ও ইস্তিগফারের ব্যবস্থা রেখেছেন। বিশেষ কিছু দিবস ও রজনী দিয়েছেন, এর মধ্যে অন্যতম ও বিখ্যাত হলো শবে বরাত। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত ‘শবে বরাত’। শবে বরাত কথাটি ফারসি। শব অর্থ রাত, বরাত অর্থ মুক্তি; শবে বরাত মানে মুক্তির রজনী। আরবি হলো ‘লাইলাতুল বরাত’। হাদিস শরিফে একে ‘নিসফ শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্যরাত বলা হয়েছে।

*পবিত্র কোরআনের বাণী:-* ‘হা মিম! শপথ! সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয় আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি ছিলাম সতর্ককারী। যাতে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এ নির্দেশ আমার তরফ থেকে, নিশ্চয় আমিই দূত পাঠিয়ে থাকি। এ হলো আপনার প্রভুর দয়া, নিশ্চয় তিনি সব শোনেন ও সব জানেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এ উভয়ের মধ্যে যা আছে, সেসবের রব। যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করো, তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান, তিনিই তোমাদের লালন-পালনকারী আর তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও। তবু তারা সংশয়ে খেলা করে। তবে অপেক্ষা করো সেদিনের, যেদিন আকাশ স্পষ্ট ধোঁয়াচ্ছন্ন হবে।’ *[সুরা দুখান, আয়াত: ১-১০]*

*মুফাসসিরিনগণ বলেন:-* এখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। *[তাফসিরে মাযহারি, রূহুল মাআনি ও রূহুল বায়ান]*

হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রাযি:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলা শাবানের মধ্যবর্তী রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। *[সহিহ্ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫]*

হযরত আওফ ইবনে মালিক (রাযি:) থেকে ইবনে খুজাইমা হযরত আবু বকর (রাযি:) থেকে এবং হযরত আবু মুসা আশআরী (রাযি:) থেকে এ রকম বর্ণনা করেছেন। *[সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, রাজীন: ২০৪৮; সহিহ্ ইবনে খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা: ১৩৬]*

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রাযি:) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা এ রাতে বিদ্বেষ পোষণকারী ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকারী ছাড়া বাকি সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। *[মুসনাদে আহমদ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৭৬]*

হযরত উসমান ইবনুল আস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, এ রাতে আল্লাহ্ তা’আলা মুশরিক ও ব্যভিচারিণী ছাড়া সবার ইচ্ছা পূরণ করে থাকেন। *[শুআবুল ইমান, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৮৩]*

হযরত আবু সালাবা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, যখন শাবানের মধ্যরাত আসে, তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মাখলুকাতের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান; মুমিনদিগকে ক্ষমা করে দেন, কাফিরদের ফিরে আসার সুযোগ দেন এবং হিংসুকদের হিংসা পরিত্যাগ ছাড়া ক্ষমা করেন না। *[কিতাবুস সুন্নাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৮২]*

হাদীস শরীফে আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযি:) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তিনি আরও বলেন, নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* তাঁকে বলেছেন, এ রাতে বনী কালবের ভেড়া বকরির পশমের পরিমাণের চেয়েও বেশিসংখ্যক গুণাহ গারকে আল্লাহ্ তা’আলা ক্ষমা করে দেন। *[তিরমিজি শরিফ:- ৭৩৯]*

হযরত আলী (রাযি:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* বলেছেন: ১৪ই শাবান দিবাগত রাত যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত–বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো; কেননা এদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন: কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিক প্রার্থী আছো কি? আমি রিজিক দেব; আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’আলা বান্দার বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন। *[ইবনে মাজাহ: ১৩৮৪]*

শবে বরাত উপলক্ষে রোজা রাখা, নামাজ পড়া, নামাজে কিরাত ও রুকু–সিজদা দীর্ঘ করা,কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা,দরুদ শরীফ বেশি বেশি পড়া, ইস্তিগফার বেশি পরিমাণে করা, দোয়া-রুনাজারি-কান্নাকাটি, তাসবিহ তাহলিল, যিকির আজকার ইত্যাদি করা, কবর জিয়ারত করা; নিজের জন্য, পিতামাতার জন্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মুমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা।

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে আমল করার খুব তাওফীক দান করেন।আমীন..!