মেহমানের প্রতি দায়িত্ব

মেহমানদারি একটি মহৎ গুণ, যা আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করে, বন্ধুত্বকে করে সুদৃঢ় এবং সামাজিক সৌহার্দ সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। মেহমানদারি মুসলিমের একটি বিশেষ গুণ। সাহাবা-চরিত অধ্যয়ন করলে আমরা মুসলিমের এ গুণের অনন্য নজীর দেখতে পাই। আনসার-মুহাজিরদের মেহমানদারির নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে মেলা ভার। আর তাঁরাই আমাদের পূর্বসূরী।

মেহমানদারি ছিল আমাদের নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* এর উপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর যখন তিনি হয়রান-পেরেশান হয়ে হযরত খাদিজা (রাযিআল্লাহু তা’আলা আ’নহা)* এর কাছে আসলেন তখন আম্মাজান খাদিজা (রাযিআল্লাহু তা’আলা আ’নহা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে অপদস্থ করবেন না। এরপর নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* এর যে উত্তম গুণাবলীর উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল  *(وَتَقْرِي الضَّيْف)َ * ‘আপনি তো মেহমানের সমাদর করেন’। নবীজী *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* এর এ সুন্নতকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁর হাতেগড়া সাহাবায়ে কেরাম।

হাদীস শরীফে নবী কারীম *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* বিষয়টির প্রতি তাকিদ করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* ইরশাদ করেন–

*مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ.*

*অর্থ:-* আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি যে ঈমান রাখে সে যেন মেহমানের সমাদর করে।  *[সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১৩৬]*

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* বলেছেন–

*لَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يُضِيفُ*

*অর্থ:-* যে মেহমানদারি করে না তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।  *[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪১৯]*

আরেক হাদীসে নবী কারীম *(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)* হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিআল্লাহু তা’আলা আ’নহু) কে লক্ষ করে বলেন, …নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার মেহমানের হক রয়েছে।  *[সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১৩৪]*

আর মেহমানদারির এ গুণে গুনাম্বিত ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালাম। তাঁর মেহমানদারির বর্ণনা কুরআনে কারীমে উল্লেখিত হয়েছে। আজকের অবসরে প্রথমে কুরআনে বর্ণিত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মেহমানদারির ঘটনা এবং তা থেকে শিক্ষণীয় কিছু আদব আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ্। সাথে সাথে মেহমান ও মেজবানেরও কিছু আদব আলোচনা করব। যাতে আমরা মেহমানের যথাযথ সমাদর করতে পারি এবং মেহমানদারির ফযীলত লাভ করতে পারি।

আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন–

*هَلْ اَتٰىكَ حَدِیْثُ ضَیْفِ اِبْرٰهِیْمَ الْمُكْرَمِیْنَ،  اِذْ دَخَلُوْا عَلَیْهِ فَقَالُوْا سَلٰمًا  قَالَ سَلٰمٌ  قَوْمٌ مُّنْكَرُوْنَ، فَرَاغَ اِلٰۤی اَهْلِهٖ فَجَآءَ بِعِجْلٍ سَمِیْنٍ، فَقَرَّبَهٗۤ اِلَیْهِمْ قَالَ اَلَا تَاْكُلُوْنَ، فَاَوْجَسَ مِنْهُمْ خِیْفَةً   قَالُوْا لَا تَخَفْ، وَ بَشَّرُوْهُ بِغُلٰمٍ عَلِیْمٍ.*

*অনুবাদ:-* (হে রাসূল!) আপনার কাছে কি ইব্রাহীমের সম্মানিত অতিথিদের বৃত্তান্ত পৌঁছেনি! যখন তারা ইব্রাহীমের কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম, তখন সেও বলল, সালাম এবং মনে মনে চিন্তা করল যে, এরা তো অপরিচিত লোক। অতপর সে চুপিসারে নিজ পরিবারবর্গের কাছে গেল এবং একটি মোটাতাজা (ভুনা) বাছুর নিয়ে আসল, এবং তা সে অতিথিদের সামনে রাখল এবং বলল, আপনারা খাচ্ছেন না যে! এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলল, ভীত হয়ো না। অতপর তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।  *[সূরা যারিয়াত (৫১) : ২৩-২৭]*

সূরা হুদে  আছে–

*فَمَا لَبِثَ اَنْ جَآءَ بِعِجْلٍ حَنِیْذٍ، فَلَمَّا رَاٰۤ اَیْدِیَهُمْ لَا تَصِلُ اِلَیْهِ نَكِرَهُمْ وَ اَوْجَسَ مِنْهُمْ خِیْفَةً …*

*অনুবাদ:-* অতপর সে (ইব্রাহীম আ.) অবিলম্বে তাদের আতিথেয়তার জন্য একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসল। কিন্তু যখন দেখল তাদের হাত সেদিকে (অর্থৎ বাছুরের দিকে) এগুচ্ছে না তখন তাদের ব্যাপারে তার খটকা লাগল এবং তাদের দিক থেকে অন্তরে শংকা বোধ করল।  *[সূরা হুদ (১১) : ৬৯-৭০]*

উপরোক্ত আয়াতগুলোর আলোকে উলামায়ে কেরাম মেহমানদারির কিছু আদব বর্ণনা করেছেন:—

*মেজবানের আদব সমূহ:⬇⬇*

*১)* মেজবান নিজেই মেহমানের আপ্যায়ন করবে। কেননা, ইবরাহীম আ. মেহমানের জন্য নিজেই খাবার নিয়ে এসেছেন। অন্য কাউকে আদেশ করেননি।  *[জিলাউল আফহাম, পৃষ্টা- ১৭৪]*

তাই পারতপক্ষে নিজেই আপ্যায়নের চেষ্টা করা উচিৎ। আর খাদেম বা অন্য কারো দ্বারা মেহমানদারি করালে নিজেও খাবার আনা নেয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।

*২)* মেহমান আসার পর দ্রুত মেহমানদারির ব্যবস্থা করা। *[তাফসীরে কুরতুবী (৯/৪৩]*

উপস্থিত যা থাকবে তা দিয়েই আপ্যায়ন করা। চাই তা শরবত বা চা-বিস্কুটই হোক। এরপর সাধ্য ও সামর্থ্যরে ভেতরে ভারসাম্যপূর্ণভাবে আরো ভাল কিছু করার চেষ্টা করা। কেননা, প্রথমেই ঘটা করে আপ্যায়নের জন্য মেহমানকে অভুক্ত বসিয়ে রাখা আদবের পরিপন্থী।হযরত ইব্রাহীম (আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)এর ঘটনা থেকে এই আদবটা পাওয়া যায়। সূরা হুদের আয়াতে বলা হয়েছে  *(فَمَا لَبِثَ)* অর্থাৎ মেহমান আসার পর অনতিবিলম্বে তিনি ভুনা বাছুর নিয়ে এলেন।

*৩)* আপ্যায়নের জন্য উপস্থিত যা থাকবে তার মধ্যে উত্তম ও উৎকৃষ্ট খাবার দ্বারা আপ্যায়ন করা। হযরত ইবরাহীম আ. অতিথিদের জন্য অল্প বয়সী হৃষ্টপুষ্ট বাছুর ভুনা করে নিয়ে এসেছেন। যা একটি উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু খাবার। মেহমানদারির জন্য তাঁর কাছে যা কিছু ছিল তন্মধ্যে এটিই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট।  *[ইবনে কাসীর ৪/৩৬৩; রুহুল মাআনী ১২/৯৪]*