আধুনিক দুনিয়ায় মুসলমানদের অবদান।

আধুনিক দুনিয়ায় মুসলমানদের অবদান।

আধুনিক বিশ্বে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। আজ আমরা যে সভ্য জগতে বাস করছি মাথার উপরে প্লেন, হেলিকপ্টার, রকেট উড়ছে, কামান গোলাবারুদ এবং কলকারখানা থেকে শুরু করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এসব কাদের তৈরি? কখনো কি ভেবেছি আমরা? আধুনিক বিশ্বে এতো বড় অবদান কারা রেখেছে? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এ সবই মুসলমানদের অবদান।
মুসলমানদের অবদান পৃথিবীর বুকে সকল জাতির উর্ধে । মুসলিম জাতিকে বাদ দিয়ে কোন ইতিহাস এবং কোন জ্যোতিষবিদ্যা আবিষ্কারের কল্পনা করা যায়না।
বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন বলেন যে, লন্ডনের রাস্তা যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতো তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বল তীর্থকেন্দ্র কর্ডোভার রাজপথ আলোয় উদ্ভাসিত থাকতো।
নিম্নে আমি আধুনিক দুনিয়ায় মুসলমানদের অবদান সম্পর্ক কিছু বিস্তারিত কিছু সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

সার্জারি : সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অপরিসীম। আনুমানিক ১০০০ সালের দিকে বিশ্বনন্দিত সার্জারি চিকিৎসক ছিলেন আল জাহরাত্তয়ি। তিনি সার্জারির ওপর প্রায় পনেরোশ’ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তী পাঁচশ’ বৎসর পর্যন্ত এ বইটি ইউরোপে সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনিই সর্বপ্রথম সিজার অপারেশন করেছিলেন এবং শল্য চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফরসেপ বা চিমটে জাতীয় অস্ত্র উদ্ভাবন করেন।

কফি : নবম শতকের দিকে ইয়েমেনবাসী প্রথম কফি উৎপন্ন করে। প্রথম প্রথম সুফিরা রাত জেগে ইবাদত করার জন্য কফি ব্যবহার করতো, পরে একদল শিক্ষার্থীর মাধ্যমে এ কফি মিসরের রাজধানী কায়রোতে আনিত হয়। পরে সমগ্র আরব বিশ্বে এ কফি ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকের দিকে কফি তুরস্কে পৌঁছে। ষোড়শ শতকের দিকে কফি ইউরোপে প্রবেশ করে। যে কফির কাপে চুমুক না দিলে অনেকের দিন শুরু হয় না সে কফিই মুসলমানরা প্রথম উৎপন্ন করে।

ফ্লাইং মেশিন : বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী আব্বাস ইবনে ফিরনাস ওড়ার যন্ত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন এবং সেটির সাহায্যে তিনি আকাশে উড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। নবম শতকের দিকে তিনি পাখির আকৃতির মতো বিশাল একটি কষ্টিউম তৈরি করেন এবং স্পেনের কর্ডোভার মসজিদের মিনার থেকে এ যন্ত্রের সাহায্যে তিনি শূন্যে ঝাঁপ দেন এবং কিছু সময় আকাশে উড়তে সক্ষম হন। তাই বলা চলে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের আগেই তিনি আকাশে উড়ার বিরল কৃতিত্ব দেখান।

বিশ্ববিদ্যালয় : আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম মুসলিম দেশ মরক্কো। ৮৫৯ সালে প্রিন্সেস ফাতেমা আল ফিরহি মরক্কোর ফেজে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি সনদ দেয়া হতো। পরবর্তীতে প্রিন্সেস ফাতিমার বোন মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে পুরো কমপ্লেক্সটি বা প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় কারুইয়িন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মসজিদটির নাম হয় আল কারুইয়িন মসজিদ। প্রায় ১২০০ বৎসর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বমহিমায় টিকে আছে। বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

বীজগণিত : বীজগণিতের ওপর প্রথম গ্রন্থটি রচনা করেন পার্সিয়ার বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম গণিতবিদ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজম, সপ্তম শতকে তার রচিত গ্রন্থটির নাম ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবলা, এ বইটি থেকেই মূলত বীজগণিত বা অ্যালজেবরা নামের উৎপত্তি। তার রচিত বীজগণিতের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক গণিতের যাত্রা শুরু হয়। গাণিতিক সংখ্যার বাইরে বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে অঙ্ক ধারণা তার মাথা থেকেই আসে। আল খোয়ারিজমিই প্রথম গণিতবিদ যিনি সংখ্যার ওপর ‘পাওয়ার’-এর প্রবর্তন করেন।

অপটিকসা বা আলোকবিদ্যা : মুসলমানদের দ্বারাই আধুনিক আলোকবিদ্যার শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়েছিল। এক হাজার সালের দিকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পদার্থবিদ ইবনে আল হাইছাম প্রমাণ করেন যে, বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো মানুষের চোখে প্রবেশের পরই কেবল মানুষ সে বস্তু দেখতে পায়। তার এ মতবাদ ইউক্লিড ও টলেমির ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। এ দু’জন বলেছিলেন, চোখের নির্গত আলো দ্বারাই কেবল মানুষ কোনো বস্তু দেখতে পায়। বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পদার্থবিদ ইবনে আল হাইছাম মানুষের চোখের সাথে ক্যামেরার সাদৃশ্যও আবিষ্কার করেন।

মিউজিক : মুসলিম মিউজিশিয়ানরা ইউরোপের মিউজিকের উৎকর্ষ সাধনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি সে সময়কার ইউরোপের মিউজিশিয়ানরা বাগদাদ ও কর্ডোভার মিউজিশিয়ানদের সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতে পারেনি। ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে যে সব বাদ্যযন্ত্র এসেছে সেগুলোর মধ্যে এমন কিছু বাদ্যযন্ত্র ছিল যেগুলো থেকেই পরে ভায়োলিনের উৎপত্তি। মনে করা হয় আধুনিক মিউজিকের অনেক স্কেলও আরবি বর্ণ থেকে এসেছে।

টুথব্রাশ : মহানবী (সাঃ) দাঁতকে সুস্থ, সতেজ ও পরিষ্কার রাখার জন্য নিয়মিত মেসওয়াক ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে এ মেসওয়াকই বিবর্তিত হয়ে আবিষ্কার হয় টুথব্রাশ।

গাড়ির স্টিয়ারিং : গাড়ি কিংবা যানবাহনে স্টিয়ারিং অপরিহার্য, আর মুসলমানরা এ স্টিয়ারিং আবিষ্কার করেন। বলা চলে এ আবিষ্কারের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটেছে। বর্তমানে এ স্টিয়ারিং কেবল যান চলাচলেই ব্যবহৃত হচ্ছে না বরং ভারী জিনিসপত্র উত্তোলনের কাজেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ১২ শতকে আল জাবারির আবিষ্কৃত এ প্রযুক্তি বিশ্বের প্রায় সকল যান্ত্রিক যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হাসপাতাল : আধুনিক বিশ্বে রোগীর চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতাল ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তা সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা করেন মুসলমানরা। নবম শতকে মিসরে এ হাসপাতাল ব্যবস্থার সূচনা হয়। ১৮৭২ সালে আহমদ ইবনে তুলুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় মিসরের রাজধানী কায়রোতে। বিনামূল্যে এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। কায়রো থেকেই পরবর্তীতে এ ধরনের হাসপাতাল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
এমনিভাবে দেখা যায় রাসায়ন বা কেমিস্ট্রির জন্মদাতাও মুসলমান ছিলেন। যুদ্ধের কৌশল এবং আগ্নেয়াস্ত্র সম্মন্ধে বিখ্যাত আরবি গ্রন্থ “আল ফুরুসিয়া ওয়াল মানাসিব আল হারারিয়া” তারাই রচনা করেছেন বিশ্ববাসীর জন্য। ভুগলেও মুসলমানদের অবদান অনেক, উনসত্তর (৬৯) জন মুসলিম ভুগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম যে মানচিত্র এঁকেছিলেন আজ তা পৃথিবীর বিস্ময়।
ইবনে ইউনুসের অক্ষরেখা ও দ্রাখিমা মন্ডল নিয়ে গবেষণার ফল ইউরোপ মাথা পেতে নিয়েছে। কম্পাস যন্ত্রের আবিষ্কারক ইবনে আহমাদ। পানির গভীরতা এবং সমুদ্রের স্রোত মাপের যন্ত্রের আবিষ্কারক ইবনে আব্দুল মাজিদ। বিজ্ঞানের উপর ২৭৫ খানা গবেষণা মুলক পুস্তক লিখেছেন আলকিন্দ। ৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞানে একশত রকমের যন্ত্র তৈরির নিয়ম ও ব্যাবহার প্রণালী এবং তার প্রয়োজনীতা নিয়ে যুগ্মভাবে গ্রন্থ রচনা করেছেন মিঃহাসান, মিঃ আহমাদ এবং মুহাম্মদ। ভুতত্ব সম্মন্ধে বিখ্যাত গ্রন্থ “মুজাম আল উবাদার” রচয়িতা ছিলেন ইয়াকুব ইবনে আব্দুল্লাহ।  ৭০২ সনে তুলা হতে তুলট কাগজ প্রথম সৃষ্টি করেন ইউসুফ ইবনে উমার। জাবীর ইবনে হাইয়ান- ইস্পাত তৈরি, ধাতু শোধন, তরল বাম্পীয় করন, কাপর ও চামড়া রঙ করা, লোহার মরিচা প্রতিরোধক বার্নিশ এবং লেখার পাকা কালির আবিষ্কারে অমর হয়ে রয়েছেন।
আকাশ জগত পর্যবেক্ষনের করার জন্য যে মান-মন্দিরের কথা আমরা শুনে থাকি তার ও আবিষ্কারক হাজ্জাজ ইবনে মাসার এবং হুসাইন বিন ইসহাক।
বর্তমানে আমাদের সামনে যে প্রাচীনযুগ মধ্যযুগের ইতিহাস রয়েছে তার ও মুল রচয়িতা অধিকাংশ মুসলমান, জেমন- আল বেরুনি, ইবনে খালদুন, ইবনে বতুতা, আলী বিন হামিদ বাইহাকি, জিয়াউদ্দিন বারনী, মুহাম্মদ খোয়ী, আমীর খসরু, বাবর এবং ইয়াহিয়া বিন আহমদ সবাই আজও অমর।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল আজ আমরা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করি। আজ আমরা ভুলে গেছি আমাদের উত্তরসূরি কারা! ভুলতে বসেছি নিজেদের ইতিহাস। মুসলমানদের জন্য নিজেদের ইতিহাস জানার প্রয়োজন অপিরিশীম । ইতিহাস জাতীর মেরুদণ্ড। যে জাতীর ইতিহাস নেই তাদের কিছুই নেই। পশ্চিমা তথ্যসন্ত্রাসীদের হামলায় নিজেদের ইতিহাস আজ হাতছাড়া করতে বসেছে মুসলমানরা। এভাবে অবহেলা করলে আমাদের আগামী প্রজন্ম জানতে পারবেনা একসময় মুসলমানদের গোড়া কতটা মজবুত ছিল। কেন তাদের ভয়ে পরাশক্তিদ্বয় থরথর কেঁপেছিল! পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরবে হবে মুসলমানদের বীরত্বগাঁথা ইতিহাস। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে দেখো, মুসলমানরা জঙ্গি নয় বরং আধুনিক বিশ্বের রুপকার।