দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৯+২০

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৯+২০

“কি হবে আজকে রাতে?
_”অহনার খেলা শেষ হবে।
_”কিন্তু কিভাবে?
_”ওইভাবেই যেভাবে ও বর্তমানে নিজেকে সবার সামনে ঈশানের বেবির মা দাবি করছে।
_”হ্যাঁ তো?
_”তো আর কি?অহনা ঈশানের বেবির মা তো হবে ঠিকই কিন্তু সে কথা ঈশানকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। কারণ আজ রাতের কিছুই ঈশানের নিজ ইচ্ছেতে হবে না। যা হবে সব মেডিসিনের পাওয়ারে!
_”কি বলছো এসব তুমি?
_”হুম শুধু অপেক্ষা করতে থাকো।
জমবে খেলা আজকের ঘন কুয়াশা রাতে!
_”হ্যাঁ ঠিক আছে কিন্তু কি খেলা জমবে? তুমি একটু পরিষ্কার করে বলো! আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
_”এমন মোটা মাথায় কিছু ঢুকবেই না ‌
_”আচ্ছা ঠিক আছে আমার মাথা মোটা খুশি? তবুও বলো প্লিজ!
_”দেখো অহনা তো নিজেকে ঈশানের বেবির মা দাবি করছে তাই না?
_”হ্যাঁ করছে।
_”কিন্তু আদৌ তো সেটা সত্যি নয়। ও যেটা বলছে সেটা শুধুমাত্র মজা করার জন্যই বলছে। কিন্তু এই মজাই ওর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে।
_”কিভাবে কাল হয়ে দাঁড়াবে?
_”দেখো আজকে যেই মেডিসিন ঈশানের জলে তুমি মিশিয়ে দিয়েছো। ওটা কিন্তু কোন সাধারন মেডিসিন নয়।
_”তাহলে এটা কি রকম মেডিসিন?
_”আমি বলছি তুমি শান্ত হয়ে শোনো!
মেডিসিন মিশানো জল খেলে ঈশান আর নিজের মাঝে থাকবে না। ওর মন যেটা চাইবে ও ঠিক সেটাই করবে।
আর ঈশান যে অহনা কে পছন্দ করে সেটা অহনা না বুঝলেও আমি আর তুমি কিন্তু ঠিকই বুঝি।
_”হ্যাঁ বুঝি তো? অহনা কে পছন্দ করার সাথে এই মেডিসিনের কি সম্পর্ক?
_”তুমি সত্যিই খুব গাধা! মানুষ যাকে পছন্দ করে তাকে তো ঘোরে অঘোরে সব সময় কাছে পেতে চায় তাই না? ঈশানও কিন্তু অহনাকে কাছে পেতে চায়। কিন্তু নিজের ইগোর জন্য সেটা প্রকাশ করতে পারে না। এখন যখন মেডিসিন এর প্রভাবে ঈশান নিজের জ্ঞানে থাকবে না। তখন তো আর এগো এসে ঈশান কে অহনার কাছে যেতে বাঁধাও দিতে পারবে না। ফলে সেটাই ঘটবে যেটা এখন অহনা বলে বেড়াচ্ছে।
_”আমি তো এতে কোনো লাভ দেখছি না মীরা। শুধুমাত্র একটা মেয়ের অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোরজবস্তি করে তার সম্মানের উপর আঘাত হানা হচ্ছে। এটা ক্ষতি ছাড়া কখনই লাভ হতে পারে না। আর আমি এটাকে সমর্থনও করি না।
_”ঠিক আছে । আমাকে একটা কথা বলো তো! তুমি আসলে অহনাকে ভালোবাসো নাকি অন্যকিছু কে?
_”মানে কি বলতে চাও তুমি?
_”আমি কি বলতে চাই সেটা তুমি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছো। এখন প্রশ্নের উত্তরটা দাও!
_”অবশ্যই আমি অহনাকেই ভালোবাসি! অন্য কোনো কিছুকে নয়।
_”তাহলে ঈশান যদি অহনার সাথে কিছু করে তাতে তোমার প্রবলেম কি? তোমার তো অহনাকে পেলেই হলো।
_”হুঁ ঠিক আছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু ওদের দুজনের মাঝে কোন কিছু হওয়ার সাথে আমার অহনাকে পাওয়ার কি সম্পর্ক?
_”সম্পর্ক আছে আছে রিজওয়ান! সেটা তুমি হয়তো বুঝতে পারছ না।
_”বুঝতে পারছিনা বলেই তোমাকে প্রশ্ন করছি। যদি পারতাম তাহলে হয়তো প্রশ্ন করতাম না।
_”শোনো রিজওয়ান!
আজকে যখন ঈশান নিজের অজান্তে অহনার সাথে কোন কিছু করে ফেলবে। আর সেটার দায়ে অহনা যখন সত্যি সত্যি সন্তান-সম্ভবা হয়ে পড়বে। তখন ঈশান কী ওই সন্তানকে নিজের সন্তান বলে মেনে নেবে? বলো?
_”কেন মানবে না?
_”কেন মানবে? কারণ ঈশান তো জানেই না ও অহনার সাথে কিছু করেছে। তাহলে কিছু না করা সত্ত্বেও কেন মেনে নিবে ওই সন্তানকে? তাছাড়াও তুমি একটু আগে ঈশানের সামনে যে কথাটা বললে অহনাকে।সেটা শোনার পর তো ঈশান ভাবছে ওই সন্তান তোমার।
_”হ্যাঁ ভাবছে আবার কি?পুরো বিশ্বাস করছে।
_”তাহলে তুমি বুঝতে পারছো না এখন যদি অহনা সত্যি সত্যি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় তাহলে অহনার কি অবস্থা হবে?
_”হু বুঝতে পারছি। ভাইয়া ওকে নিজের জীবন থেকে সারা জন্মের মত সরিয়ে দিবে।
_”ইয়েস এইতো বুঝতে পেরেছো। আর সেই সুযোগেই তুমি পেয়ে যাবে অহনাকে আর আমি পেয়ে যাবো ঈশানকে। কি খুশি?
_”খুব! যাইহোক এখন ফোন রাখি। তোমার সাথে পরে কথা হবে।

রিজওয়ান ফোন রেখে নিজের রুমে চলে গেল।আর অন্যদিকে অহনা ঈশান কে খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা হয়ে ঈশানের ঘরে ঢুকলো। অহনাকে দেখামাত্রই ঈশান দাঁড়িয়ে গেলো।
_”কি ব্যাপার তুমি এখানে? চলে যাও আমার সামনে থেকে! আমি তোমাকে আর কোনদিন দেখতে চাই না।
_”স্যার আপনি আমার কথা গুলো শুনুন প্লিজ!
_”আর কি কথা শুনবো তোমার? অহনা তোমার নির্দোষিতার অযুহাত দেখাতে দেখাতে আমাকে বোর করে ফেলছো তুমি। আর কত অজুহাত দেখাবে?
_”স্যার আমি আপনাকে কিছুই দেখাবো না। শুধু আমার কথাগুলো শুনুন! প্লিজ স্যার!
_”কি শুনবো বলো? এরপর আর কি শোনার থাকতে পারে? যা শুনার তাতো আমি নিজ কানে শুনে আসলাম।
_”স্যার আপনি যা কিছু শুনেছেন,,,,,
_”ঠিক নয় ভুল। তাইতো? আমি তো জানতাম তুমি এসব বলার জন্যেই আমার কাছে আসবে। আমার উচিত হয়নি তোমাকে আমার জীবনে ঢোকার সুযোগ দেওয়া! এখন তুমি রিজওয়ানকেও ইউজ করছো আর সাথে আমাকেও।
_”স্যার প্লিজ এভাবে বলবেন না! আমাকে শুধু একটা সুযোগ দিন বলার! আমি আপনার পায়ে পড়ছি।
এতোটুকু বলেই অহনা কাঁদতে কাঁদতে ঈশানের দু’পা শক্ত করে ধরলো!
_”স্যার আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আমি আপনাকে ভালোবাসি! আমি আপনার সাথে কোন মিথ্যাচার করিনি।কেন বারবার আপনার চোখেই ভুল জিনিস ধরা পড়ছে আমি জানিনা। নাকি কেউ ইচ্ছে করে এসব করছে সেটাও আমি জানি না। আমি শুধু জানি আমি আপনাকে হারাতে চাইনা!
_”অহনা পা ছাড়ো!
_”স্যার প্লিজ আপনি আমার কথা শুনুন! আমি আর কিছুই চাইনা।
_”ঠিক আছে শুনবো। পা ছেড়ে সোফায় বসো।
_”না স্যার পা ছাড়বো না। আমার জায়গা আপনার পায়ের কাছেই থাক! তবুও আপনি আমার কথাগুলো শুনুন!
_”আমি তোমার সব কথা শুনবো। কিন্তু তার আগে তুমি এসে আমার পাশে বসো।
ঈশানের বারবার অনুরোধে অহনা সোফায় গিয়ে বসলো।
_”হ্যাঁ এখন বলো কি বলবে?
_”স্যার আপনি পুরো কথাটা শুনতে পাননি। রিজওয়ান স্যার আমাকে প্রশ্ন করেছেন আপনি কি ধারণা করছেন আমার এই মজা নিয়ে সেটা আমি জানি কিনা? আর তারপর উনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন যে আপনি ভাবছেন সেটা,,,,,, বাকি অর্ধেক কথাটা তো আপনি নিজেই শুনতে পেয়েছেন স্যার। আর তারপর ওই অর্ধেক শোনা কথাটা নিয়ে আমাকে ভুল বুঝছেন। স্যার আমি প্রেগনেন্ট নই। আপনি ভুল বুঝছেন স্যার!
_”আমি ভুল সেটা প্রমান করতে পারবে? মানে তোমার কাছে কোন প্রমাণ আছে?
_”প্রমাণ করতে পারবো স্যার। আমি প্রমাণ করতে পারবো।
_”কিভাবে?
_”স্যার আপনি না আমার আল্ট্রা করাতে চেয়েছিলেন?
_”হুঁ চেয়েছিলাম তো।
_”ঠিক আছে স্যার আমার আল্ট্রা করান। তাহলেই পরিস্কার হয়ে যাবে আমি কোন মিথ্যে বলছি না।
_”মিথ্যে বলছো না?
_”না স্যার। আমি একটুও মিথ্যে বলছি না।
_”কিন্তু আমি যে তোমার কথা বিশ্বাস করতে পারছিনা।
_”স্যার প্লিজ আমাকে বিশ্বাস করুন!
_”বিশ্বাস করি কিভাবে তোমার জন্য তো আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।
_”স্যার কি ক্ষতি হয়েছে আপনার?
_”এখন ওসব কথা ছাড়ো। আমার একটু কাজ আছে বাইরে যেতে হবে। তুমি ঘরে রেস্ট নাও!
ঈশান অহনাকে রেস্ট নিতে বলে বেরিয়ে চলে গেলো।ঈশান চলে যাওয়ার পর অহনা রেস্ট করার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়লো।কিন্তু রেস্ট করতে করতে কখন যে দু’চোখের পাতা লেগে আসলো সেটা অহনা টেরই পেলো না।ঘুম ভাঙার পর অহনা ঘড়িতে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। রাত আটটা বাজতে চলেছে। মানে অহনা প্রায় চার ঘন্টার মতো ঘুমিয়ে ফেলেছে। নিজের ঘুমের এই দীর্ঘ পরিমাণ দেখে অহনা লাফ দিয়ে উঠে বসলো।

অহনাকে এভাবে হঠাৎ লাফিয়ে উঠতে দেখে ঈশান অবাক হয়ে গেল!
_”কি ব্যাপার দুঃস্বপ্ন দেখেছো?
_”না স্যার। কিন্তু আপনি কখন এসেছেন?
_”একটু আগেই।
_”আমাকে ডাকলে না যে?
_”ঘুমাচ্ছো তাই ডাক দিতে ইচ্ছে হলো না।
_”আমি কতক্ষণ ধরে ঘুমোচ্ছি?
_”সেটা তো আমি বলতে পারব না। তবে আমি এসে অনেকক্ষণ ধরেই তোমাকে দেখছি!
_”স্যার আপনি আমাকে দেখছিলেন?
_”হ্যাঁ দেখছিলাম।
__”কি দেখছিলেন স্যার?
_”একখণ্ড মায়া,,,,

ঈশান কথা বলে শেষ করার আগেই আরিয়ান ঘরে ঢুকলো।
_”অহনা তুমি একটু আমার রুমে এসো তো। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে!
_”স্যার আমার সাথে?
_”হ্যাঁ তোমার সাথে।

অহনা ধীরে ধীরে আরিয়ানের ঘরে গেল। অহনাকে এক কোনায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান বলল,
_”কি ব্যাপার দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখানে এসে বসো!
_”স্যার আপনি আমাকে কি বলবেন? আমার তো খুব ভয় করছে!
_”ভয়ের কিছু নেই অহনা। তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবো মাত্র ‌।
_”জি স্যার বলুন!
_”তুমি কি সত্যিই প্রেগন্যান্ট?
আরিয়ানের প্রশ্নে অহনা চমকে উঠলো! সেই সাথে নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়লো।
_”স্যার আমি প্রেগনেন্ট নই। ওটা একটা মজা ছিল মাত্র! কিন্তু মজাটা এভাবে সিরিয়াস হয়ে যাবে আমি বুঝতে পারিনি। আপনি আমায় মাফ করে দিন প্লিজ!
_”দেখো অহনা সবকিছু ছোট্ট একটা সরি দিয়ে মিটে যায় না। তুমি জানো তোমার এই মজার জন্য কত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে?
_”কি হয়েছে স্যার? কার কী ক্ষতি হয়েছে?
_”ঈশানের ক্ষতি হয়েছে।
_”স্যারের? কি ক্ষতি হয়েছে?
_”ঈশান কে ওনারশিপ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য উপর মহল থেকে চাপ আসছে। তুমি জানো তোমার এই একটা মজার জন্য ঈশানের ক্যারিয়ার টা বরবাদ হয়ে যেতে পারে?
_”স্যার আমি বুঝতে পারিনি আমার এই মজার জন্য এতো কিছু হয়ে যেতে পারে। স্যার প্লিজ আপনি যেকোন মূল্যে সবকিছু ঠিক করে দিন! আমি আপনাদের মেডিকেল ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো! ঈশান স্যারের জীবন থেকেও অনেক দূরে চলে যাবো! তবুও আমার জন্য যেন উনার কোনো ক্ষতি না হয়।
_”অহনা তুমি শান্ত হও! এতো অস্থির হওয়ার মতো কিছু হয়নি। তাছাড়াও তুমি ঈশানের জীবন থেকে চলে গেলে সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে এটা ভুল।
_”তাহলে আমি কি করবো স্যার? আমার মাথায় কিছু আসছে না।
_”তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তুমি শুধু আমাকে এটা বলো প্রেগনেন্ট সংক্রান্ত ঘটনা টা না হয় দুষ্টুমি। কিন্তু বিয়ের যে কথা বললে সেটা? ঈশান কি তোমাকে সত্যিই বিয়ে করেছিলো?
_”স্যার সবকিছু দুষ্টুমি হলেও এটা সত্যি। স্যার আমাকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু বিয়ের ডকুমেন্টসগুলো স্যার নিজে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন।
_”হোয়াট? ঈশান ছিঁড়ে ফেলেছে?
_”জি স্যার।
_”কিন্তু কেন?
_”এটা বলতে পারবো না স্যার।
_”এই ছেলেটা যে কেন কি করে কিছু বুঝতে পারিনা। যাই হোক তুমি নিজের ঘরে যাও। আর এসব নিয়ে ভেবো না! আমি দেখছি কি করা যায়!

আরিয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে অহনা দৌড়ে এসে ঈশানের রুমে ঢুকলো। ঈশান কিছু বুঝে উঠার আগেই অহনা হতাশ ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়লো। আর তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করলো!অহনাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ঈশানের কিছুটা খারাপ লাগলো। ঈশান ধীরেসুস্থে অহনার পাশে এসে বসলো।
_”কি ব্যাপার কাঁদছো কেন?
_”স্যার আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!
_”এতো কষ্ট হচ্ছে কেন?
_”জানিনা স্যার। তবে খুব কষ্ট হচ্ছে!
_”কোথায় যেন চলে যাবে তুমি বাবাকে বললে শুনলাম।
_”অনেক দূরে চলে যাবো স্যার! অনেক দূরে!
_”অনেক দূরে কোথায়?
_”স্যার যেখানে দু’চোখ গিয়ে থামবে সেখানেই।
_”দু’চোখ যদি জঙ্গলে গিয়ে থামে তাহলে?
_”তাহলে জঙ্গলেই চলে যাবো।
_”অহনা জঙ্গলে কিন্তু বাঘ,ভাল্লুক, সিংহ,সাপ বিশেষ করে তেলাপোকা আছে।
_”থাকুক আমাকে ছিঁড়ে খাক। আমার মরে যাওয়াই ভালো!
_”কি এমন হলো যে একেবারে মরে যেতে চাইছো?
_”স্যার আমার জন্য আপনার এতো বড় ক্ষতি হয়ে গেলো। শুধুমাত্র আমার এই,,,,,
_”কি ক্ষতি হয়েছে আমার?
_”স্যার ওনারশিপ থেকে আপনাকে বাদ দেওয়ার কথা হচ্ছে। এর থেকে বেদনা দায়ক খবর আর কি আছে? আমার জন্য আপনার ক্যারিয়ারটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে স্যার!
_”এখানে ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার কি আছে? আমাকে যদি ওনারশিপ থেকে বাদ দিতে চায় তাহলে দিক। আমার তো কোন সমস্যা নেই।
_”কোন সমস্যা নেই স্যার?
_”না কোন সমস্যা নেই।
_”তাহলে এরপর আপনি কি করবেন?
_”কি করবো আবার? লন্ডন ফিরে যাবো। ওখানে আমার কোন কিছুর অভাব নেই।
_”চলে যাবেন?
_”হ্যাঁ চলে যাবো।
_”স্যার এই দেশ ছেড়ে চলে না যাওয়া ছাড়া কি আর কোন উপায় নেই?
_”জানিনা উপায় আছে কিনা। তবে আমি চলে যাওয়াটাই উচিত মনে করছি!
_”স্যার প্লিজ আপনি যাবেন না!
_”কেন যাবো না? তাছাড়াও আমি চলে গেলে তোমার প্রবলেম কি?
_”স্যার আপনাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না! আপনি চলে গেলে আমি হয়তো মরেই যাবো!
_”সত্যিই কি তাই?
_”হ্যাঁ স্যার তাই।
_”আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
_”কেন স্যার? আমি আপনার এতো ক্ষতি করেছি বলে?
_”না ঠিক সে জন্য নয়।
_”তাহলে?
_”না একটু আগেই তো তুমি বললে তোমার দু’চোখ যেখানে গিয়ে থামবে। তুমি সেখানেই চলে যাবে।তো আমি ভাবছি যে মানুষটা আমি দেশে থাকা অবস্থায় আমাকে ছেড়ে যেখানে দু’চোখ গিয়ে থামবে।
সেখানে চলে যাবে। সে মানুষটা আমি দেশ থেকে চলে গেলে কেন মরে যাবে?
না মানে এমনিতেও তো সে আমাকে ছেড়ে চলেই যাচ্ছে তাহলে আমি দেশে থাকলেই কি আর না থাকলেই বা কি?
ঈশানের কথা শুনে অহনা শব্দ করে কান্না আরম্ভ করলো!
_”স্যার আপনি কেন বুঝতে পারেন না আমি আপনাকে ভালোবাসি! আপনাকে ছাড়া আমি,,,,,
_”তাহলে এমন কথা কেন বলছো যেটা করতে পারবে না?
_”স্যার আমি কি বলেছি?
_”ওই আমাকে ছেড়ে, আমার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাবে।
_”স্যার বলেছি তার কারণ আমার জন্য আপনার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে!
_”যেই কাজ করে দেখাতে পারবে না সেটা অযথা বলোনা!
_”স্যার আমি আপনাকে ভালোবাসি! তাই পারিনা,,,
_”আমি কিন্তু তোমাকে করে দেখাতে বলিনি। আমি শুধু বলছি এতো ইমোশন কেন তোমার?
_”জানিনা স্যার!
_”আমি কিন্তু জানি।
_”কি জানেন স্যার?
_”তোমার এতো ইমোশন কেন সেটাই জানি।
_”কেন স্যার?
_”তুমি ডঃ ঈশান খান কে খুব ভালোবাসো তাই!
_”স্যার,,,,,
_”বিশ্বাস করি তুমি খুব ভালোবাসো!

ঈশানের কথা শুনে অহনা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।অহনাকে এভাবে লজ্জা পেতে দেখে ঈশান অহনার মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোঁখের জল মুছে দিতে দিতে বলল,
_”থাক আর লজ্জা পেতে হবে না!সারাদিন যখন ভালবাসি ভালবাসি বলতে থাকো তখন এতো লজ্জা কোথায় থাকে?
_”স্যার,,,,
_”হুম বলো কোথায় থাকে?
_”জানিনা।
_”মেয়েরা ভাব দেখায় ওদের খুব লজ্জা! আসলে ওদের কিন্তু বিন্দুমাত্রও লজ্জা নেই।
_”আপনি কিভাবে জানেন?
_”এইযে আমার সামনেই একজনকে দেখছি। এখন এতো ভাব করছে যেন সে দুনিয়ার সবথেকে বেশি লাজুক! অথচ একটু আগেই ভালোবাসি বলে ভ্যান ভ্যান করে আমার কানটা ব্যথা করে ফেলেছে।
_”স্যার আপনি কি আমার উপর খুব রেগে আছেন?
_”কেনো রেগে থাকবো?
_”আমার ভুলের জন্য এতোকিছু ঘটে গেলো তাই!
_”রেগে ছিলাম। কিন্তু এখন আর রেগে নেই।
_”স্যার আপনার রাগ কিভাবে চলে গেলো?
_”সেটা তো বলা যাবেনা।
_”কেন স্যার?
_”কারণ ওটা তো সিক্রেট।
_”প্লিজ স্যার বলুন!
_”কি বলবো?
_”আপনার রাগ কিভাবে চলে গেলো?
_”যদি বলি তোমার চোঁখের জলে!
_”মানে স্যার?
_”মানে হলো তুমি কাঁদলে বলে সব রাগ চলে গেলো!
_”স্যার আমি কাঁদলে আপনার রাগ কেন যাবে?
_”কেন রাগ চলে গেছে তাতে তুমি খুশি হও নি?
_”খুশি তো হয়েছি স্যার। কিন্তু কারণ জানতে চাইলাম মাত্র!
_”তোমার চোঁখের জলে আমার রাগ শেষ হয়ে যাওয়ার কারন জানতে চাও?
_”হ্যাঁ স্যার জানতে চাই।
_”তাহলে আরেকটু কাছে এসো!
_”কেন স্যার?
_”আগে এসো,,,,!

অহনা ধীরে ধীরে ঈশানের অনেক কাছে আসলো।অহনা ঈশান কে কিছু বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই ঈশান অহনার মাথাটা নিজের বুকে আলতো করে চেপে ধরে বললো,
_”কিছু শুনতে পাচ্ছো?
_”পাচ্ছি তো!
_”কি?
_”আপনার হার্টবিটের ধুকধুক শব্দ!
_”শব্দ টা কেমন?
_” খুব মিষ্টি!
_”কিন্তু জানো যখন তোমার চোখ থেকে জল বেরোয় তখন এই শব্দের মিষ্টতা হারিয়ে যায়। এই ক্ষীণ শব্দটা একটা বিকট শব্দে পরিণত হয়।
ঈশানের কথা শুনে অহনা নিজের মাথাটা ঈশানের বুক থেকে সরিয়ে আনলো।
_”স্যার কেন?
_”এটাও বলতে হবে?
_”স্যার বলুন না প্লিজ!
_”যখন তুমি চোঁখের জল ফেলো তখন কি মনে হয় জানো?
_”কি?
_”মনে হয় আমার হৃদপিণ্ডটা ছুরি দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে সেখান থেকে রক্ত ঝরানো হচ্ছে। আর হৃদপিণ্ডটা যন্ত্রণায় বিকট শব্দে আকুতি মিনতি করছে!
_”স্যার!
_”বলো!
_”আমার জন্য আপনি এতো কষ্ট পান?
_”কেন বিশ্বাস হয়না?
_”বিশ্বাস হয়তো।
_”এখন যাও তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি!
_”স্যার আপনি আনবেন?
_”কেন আনতে পারি না?
_”হ্যাঁ তা তো অবশ্যই পারেন। কিন্তু কেন আনবেন?
_”তুমি আমার ওয়াইফ তাই!

অহনা হালকা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই অহনা চমকে উঠলো রিজওয়ান কে বিছানায় বসে থাকতে দেখে।
_”একি আপনি এখানে?
_”আমার ভাইয়ার ঘরে আমি তো আসতেই পারি।
_”এটা কিন্তু এখন আপনার ভাইয়ার ঘর একা নয়। এই ঘরে এখন আমিও থাকি। তাই ঘরে ঢোকার আগে আপনার নক করে ঢুকা উচিত ছিলো!
_”অহনা উচিত-অনুচিতের জ্ঞান আমার আছে। আশা করছি সেটা আমার তোমার থেকে শেখা লাগবে না!
_”জানি স্যার আপনার আমার থেকে কিছু শেখার নেই। যাইহোক কি বলতে এসেছেন সেটাই বলুন!
_”তোমাকে বলেছিলাম না ভাইয়ার থেকে দূরে থাকতে!
_”হ্যাঁ বলেছিলেন।
_”তাহলে তুমি কেন ভাইয়ার এতো কাছাকাছি থাকছো?
_”তাতে আপনার প্রবলেম কি?
_”আমার প্রবলেম এটাই কারণ ভাইয়া তোমাকে অপমান করছে।
_”করলে আমাকে করছে।তাছাড়াও হাসবেন্ড ওয়াইফ এর মাঝে আপনি থার্ড পারসন হয়ে কেন ঢুকছেন?
_”আমি থার্ড পারসন?
_”অবশ্যই থার্ড পারসন। দেখুন আমি চাইনা আমার আর ঈশান স্যারের মাঝে আর কোন ঝামেলা হোক!
আর এখন পর্যন্ত যত ঝামেলা হয়েছে সব আপনার জন্যই হয়েছে। তাই প্লিজ আপনি এখানে থেকে চলে যান।
_”যাবো তো। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাচ্ছি আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি! আর তোমাকে আমার হতেই হবে।
_”বাসতে থাকুন! আমিও আপনাকে বলে রাখছি আমার ভালোবাসা শুধুমাত্র ঈশান স্যারের জন্য! আমার পুরো জীবন আমি স্যারের জন্য উৎসর্গ করতে রাজি আছি। তবুও কোনদিন আপনার হবো না।
_”সেটা সময় বলে দিবে।

রিজওয়ান রেগে ঈশানের ঘর থেকে দ্রুত বের হতে নিলো। কিন্তু দরজার মাঝ বরাবর ঈশানের সাথে জোরে ধাক্কা লেগে দাঁড়িয়ে পড়লো রিজওয়ান।
_”কি ব্যাপার রিজওয়ান চোঁখে দেখতে পাও না?
_”সরি দেখতে পাইনি!
_”এখানে কেন এসেছিলে?
_”আসতে পারি না?
_”আসতে তো অবশ্যই পারো। কিন্তু যতক্ষণ আমার ওয়াইফ আমার রুমে থাকবে ততক্ষণ আসতে পারবে না।
_”কেন?
_”কারন আমার ওয়াইফের সাথে তোমার কোনো রকমের অসভ্যতামি আমি মেনে নেবো না!
_”আমি আবার কি অসভ্যতামি করলাম?
_”না জানার ভান করছো? তুমি কি ভেবেছো আমি কিছু শুনতে পাইনি? বধির মনে হয় আমাকে?
_”আমি তোমাকে বধির বললাম কখন? তুমি কি শুনতে পেয়েছো সেটা তুমিই ভালো জানো।
_”রিজওয়ান অহনাকে থ্রেট করাটা বন্ধ করো! আমি জানি তোমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করো!কিন্তু অহনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমার ওয়াইফ ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার এইসব বরদাশত করবো না। বুঝতে পেরেছো?
নও গেট লোস্ট!

রিজওয়ান চলে যাওয়ার পর ঈশান ভেতরে ঢুকলো। ঈশান ঢোকামাত্রই অহনা দাঁড়িয়ে গেল।
_”স্যার প্লিজ আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না! আমি রিজওয়ান স্যারকে ডাকিনি। এমনকি আমি তো এটাও জানতাম না উনি আপনার রুমে আসতে পারেন।
_”আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি?
_”স্যার আপনি তো কখনোই কিছু বলেন না। সবকিছু নিজের মনের ভেতরে রেখে দেন। আর তারপর নিরবে ঘৃণা করতে থাকেন। এটাই তো আমি মেনে নিতে পারিনা!
_”ঠিক আছে এখন এসব কথা রাখো! আমি জানি তুমি রিজওয়ান কে ডাকোনি। এবং এটাও জানি রিজওয়ান নিজে থেকেই এখানে এসেছে। একটা ঝামেলা পাকানোর জন্য। যাইহোক এখন খেতে বসো!
অহনা আর কোন কথা না বাড়িয়ে খেতে বসে পড়লো। কিন্তু খাবারের সামনে বসে অহনা কে না খেতে দেখে ঈশান অবাক হয়ে বললো,
_”কি ব্যাপার খাচ্ছো না যে?
_”স্যার ভাবছি কিভাবে খাবো?
_”কিভাবে খাবে মানে? খাবারে কি সমস্যা হয়েছে?
_”স্যার আমার হাত কেটে গেছে। তাই ভাবছি কিভাবে খাবো।
_”হাত কেটে গেলো কিভাবে? আর কখন?
_”ওই স্যার আপনার পা ধরে ক্ষমা চাইছিলাম তখন।
_”হোয়াট? আমার পা কী ধারালো নাকি যে তোমার হাত কেটে গেল।
_”আমি সেটা বোঝাই নি স্যার।আসলে যখন আপনার পা ধরতে নিয়েছিলাম ,তখন আপনার পিছে থাকা সোফার কোনায় লেগে হাত কেটে গেছে।
_”আচ্ছা ঠিক আছে আমি চামচ আনিয়ে দিচ্ছি। চামচ দিয়ে খাও!
_”না স্যার চামচ আনাবেন না প্লিজ! আমি চামচ দিয়ে খেতে পারিনা।
_”সেকি তাহলে কিভাবে খাবে?
_”কিভাবে আবার? আপনার হাতে খাবো! আপনি আমাকে খাইয়ে দিবেন!
_”আমি?
_”হ্যাঁ আপনি।
_”কিন্তু অহনা আমি কাউকে খাইয়ে দিতে পারিনা। আসলে কখনো,,,,,
_”কাউকে খাইয়ে দেন নি সেটাই তো?
_”হ্যাঁ তাই।
_”তাহলে তো আরো ভালো হয়েছে। আপনার হাত এখনো কারো মুখে প্রবেশ করে নি।
_”তুমি এখানে ভালোর কি দেখছো? আমার অভ্যাস নেই এটা ভালো গুণ কিভাবে হতে পারে?
_”হতে পারে।দেখুন স্যার আপনার যদি মানুষকে খাইয়ে দিয়ে অভ্যাস থাকতো। মানে আমি বলতে চাচ্ছি যদি আপনি মানুষকে খাইয়ে দিতেন,তাহলে কার না কার মুখে আপনার হাতটা যেত। হতেই তো পারে সে মাসে একবারও ব্রাশ করে না।
_” কি বলছো তুমি এসব? এরকম মানুষ আবার হয় নাকি?
_”হয় স্যার হয়। এরকম অনেক মানুষ হয়। যাইহোক এখন আসুন আমাকে খাইয়ে দিন!
_”তুমি যে কথা বলেছো এখন তো আমার তোমাকে খাওয়াতে ও খুব ভয় করছে! যদি তুমি ব্রাশ না করে থাকো।
_”দেখুন স্যার একদম বাজে কথা বলবেন না। আমি প্রতিদিন তিনবার ব্রাশ করি।
_”না আমার সন্দেহ হচ্ছে!
_”ঠিক আছে তাহলে আমি খাবোই না।
অহনা রাগ করে খাবার রেখে উঠে পড়তে নিলো। কিন্তু তার আগেই ঈশান হাত ধরে টেনে অহনাকে নিজের পাশে বসিয়ে দিলো।
_”এত রাগ কেনো?
_”তাহলে কি করবো? একটা মানুষকে খেতে ডেকে আবার এতো অজুহাত,,,,
_”আমি কোথায় অজুহাত দিলাম? আমি তো বরং তোমার অজুহাত গুলোই দেখছিলাম।
_”আমার অজুহাত?
_”হ্যাঁ তোমার অজুহাত।
_”আমি আবার কি অজুহাত দিলাম?
_”আমার হাতে খেতে ইচ্ছে করছে সেটা বললেই তো পারো। হাত কেটেছে , চামচে খেতে পারবো না এতো কথা কি?
_”এতোই যখন বোঝেন তাহলে খাইয়ে দিলেই তো পারেন!
ঈশান আর কোন কথা না বলে হাতে খাবার নিলো অহনাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য।

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।