দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৬

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৬

ঈশান আর অহনার কথার মাঝখানে মিলি এসে পড়লো।
_”স্যার কংগ্রেচুলেশন!
_”কিসের জন্য?
_”স্যার আপনি বাবা হচ্ছেন তাই!
_”হ্যাঁ কিন্তু,,,
_”আমি বুঝতে পারছি যে, আপনি খুব লজ্জা পাচ্ছেন। কিন্তু স্যার এটা লজ্জার কোন বিষয় নয়। বরং এটা খুব গর্বের বিষয়।
যাইহোক স্যার এখন আমরা আসি। আপনার বেবির মাকে তো সাবধানে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে!
এতোটুকু বলেই মিলি অহনার হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটা দিলো। আর অহনা একবার পিছে ফিরে দুষ্টু মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে ঈশান কে চোখ মেরে থার্ড ফ্লোর থেকে মিলিয়ে গেলো। কিন্তু ঈশান তখনও নির্বাক হয়েই দাঁড়িয়ে রইল!
ঈশান কে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিজওয়ান এগিয়ে আসলো।
_”এসব কি হচ্ছে ভাইয়া?
_”কি সব?
_”বাহ্ এখন দেখছি একেবারে না জানার ভান করছো! একটু আগে ক্লাস রুমে যা হলো সব এক মিনিটেই ভুলে গেলে?
_”দেখো রিজওয়ান ক্লাসরুমে যা কিছু হয়েছে তাতে আমার কোন দোষ নেই। আমি নিজেও জানিনা ওই মেয়েটা এসব কেনো বলছে।
_”তাইতো তুমি জানবে কিভাবে? সব তো অহনা একাই জানে তাই না?
_”কে কি জানে সে সব কিছু আমি বলতে পারবো না।
_”তোমার কিছু বলার কোন প্রয়োজনও নেই ভাইয়া। যা হলো সেসব নিজ চোঁখেই দেখেছি। তবে একটা জিনিস আজকে পরিষ্কার হলাম ভাইয়া। তুমিও কিন্তু ডুবে ডুবেই জল খাও!
_”রিজওয়ান মুখ সামলে কথা বলো!
_”ভাইয়া কুল ডাউন! আজকে না হয় একটু নিচু গলায় কথা বলো। কারণ আজকে তোমাকে উঁচু গলায় কথা বলা সত্যিই মানাচ্ছে না। তবে এতকিছুর মাঝেও আমার না একটা বিষয় নিয়ে ডাউট হচ্ছে ভাইয়া?
_”কি বিষয়?
_”দেখো ভাইয়া! তোমাকে তো বলাই হয়নি অহনা আর আমার মাঝে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আর সেটাও তুমি দেশে আসার আরো অনেক আগে থেকেই। তো আমি ভাবছি,,, কিভাবে যে বলি!
_”যা বলার পরিষ্কার করে বলো!কারণ তুমি খুব ভালো করেই জানো এরকম হেঁয়ালি মার্কা কথা আমার একদম পছন্দ নয়।
_”আসলে ভাইয়া আমার ঐ জায়গাটাতেই ডাউট হচ্ছে।
_”কোন জায়গার ডাউট হচ্ছে কথা পরিষ্কার করে বলো!
_”না আমার ডাউট হচ্ছে বাচ্চাটা তোমার নাকি আমার? যেহেতু আমাদের একটা,,,
রিজওয়ান কথা শেষ করার আগেই ঈশান ক্ষিপ্ত হয়ে রিজওয়ানের শার্টের কলার টেনে ধরলো। আর তারপর চিৎকার করে উঠলো,
_”তোমার সাহস হয় কি করে অহনার সম্পর্কে বাজে কথা বলার? তোমাকে তো আমি ছাড়বো না!
_” ভাইয়া আমিতো কোন বাজে কথা বলিনি। যেহেতু তুমি স্বীকার করছো না ওটা তোমার সন্তান। তাহলে তো অবশ্যই আমার সন্তান।
_”শাট আপ!
জাস্ট শাট আপ! আমি তোমার মুখ থেকে আর একটাও কথা শুনতে চাই না। কারণ তুমি অহনার সম্পর্কের নোংরা কথা বলছো।
_”তাহলে মানছো অহনার সন্তানের বাবা তুমি?
_”হ্যাঁ মানছি মানছি! অহনার সন্তানের বাবা আমি! শুধু আমি। আর কেউ নয়।

ঈশান কথা শেষ করে ডানে তাকিয়ে চমকে উঠলো! সমস্ত স্টুডেন্ট-রা হাঁ করে তাকিয়ে আছে ঈশানের দিকে!
ঈশান রিজওয়ানের শার্টের কলার ছেড়ে দিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলো। কিন্তু কেবিনে ঢুকার আগেই মিলি আর অহনার মুখোমুখি হয়ে পড়লো ঈশান।অহনাকে নিজের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশানের মাথা আরও গরম হয়ে গেলো।
ঈশান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
_”কি ব্যাপার এখনো বাড়ি যাওনি তোমরা? আমার কেবিনের সামনে কি করছো?
_”স্যার অহনার শরীরটা নাকি খুব খারাপ লাগছে!
_”শরীর খারাপ লাগছে? কেন কি হয়েছে?
_”সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার।
ঈশান মিলির থেকে সরে অহনার কিছুটা কাছে এগিয়ে আসলো।
_”কি ব্যাপার এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? সেই কখন নেমেছো থার্ড ফ্লোর থেকে এতক্ষণে তো বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিলো। বাড়ি যাও নি কেনো?
_”স্যার পেটে খুব যন্ত্রণা করছে!
_”হোয়াট? কি হয়েছে পেটে?
_”স্যার মনে হচ্ছে পেটে,,,
_”বেবি কিক মেরেছে তাইতো? এটাই তো বলবে তুমি তাই না? ডিসগাস্টিং!

ঈশান রেগে কেবিনের ভিতরে চলে গেল। ঈশান কে এভাবে রেগে কেবিনে চলে যেতে দেখে অহনা হাসতে হাসতে মিলির গায়ের উপর গড়িয়ে পড়লো‌। অহনার এরকম রহস্যের হাসি মিলির কাছে খুব সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠলো। মিলি অহনার কাঁধে হাত রেখে বলল,
_”অহনা!
তুই কি সত্যিই প্রেগনেন্ট নাকি আবার স্যারকে ব্লেম দিচ্ছিস?
মিলির প্রশ্নে অহনা কিছুটা থতমত খেয়ে গেল।
_”এ,,এ,, এসব তুই কি বলছিস?
_”যা বলছি তোর অবস্থা দেখেই বলছি। তাছাড়াও স্যারকে ব্লেম দেওয়া তো তোর পুরোনো স্বভাব।
_”আহ্ ছাড় না বেবি! সময় আসলে সবকিছু বুঝতে পারবি।
_”আমি সময়ের আগে সবকিছু বুঝতে চাই। তুই যে কখন কি করিস আমাকে কিছুই বলিস না ‌।
আর তারপর বড় বড় বিপদ ফেস করতে হয় আমাদের!
_”তুই কি এখন আমাকে জ্ঞান দিবি?
_”ঠিক আছে যা জ্ঞান দিলাম না।
কিন্তু মনে রাখিস যাই করিস না কেন স্যার কে আর কোন ব্লেম দিস না!
_”আচ্ছা ঠিক আছে দিবো না। এখন চল বাড়ি যাই!
অহনা মিলির হাত ধরে টানতে টানতে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে গেলো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছতেই চারপাশের ফিসফিসানি অহনার কানে এসে ঢুকলো।এরকম গোল মিটিং করে ফিসফিসানি দেখে অহনার আর বুঝতে বাকি নেই তার বলা সেই কথায় পুরো মেডিকেল তোলপাড় হয়ে গেছে! পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পেরে অহনা দৌড়ে পালাতে নেয়, কিন্তু তার আগেই মাহিয়া এসে অহনার পথ রোধ করে দাঁড়ায়।

_”কি হলো ম্যাম পথ আটকালেন কেন? বাড়ি যাব না আমরা?
_”কেন নয়? বাড়িতো অবশ্যই যাবে। তবে তোমাকে যে একবার আরিয়ান স্যারের সাথে দেখা করে যেতে হবে।
_”কেন? আরিয়ান স্যারের সাথে আমি কেন দেখা করবো? আমি কিন্তু কিছু করিনি। এমনিতেই একবার স্যার সকালে খুব বকে দিয়েছেন! এখন আবার কি বলবেন?
_”সেটা স্যারের কেবিনে গেলেই বুঝতে পারবে। এখন যাও তাড়াতাড়ি স্যারের কেবিনে!
অহনা আর কিছু না বলে মিলির কাছে এগিয়ে আসলো।
_”মিলি এখন কি হবে?
_”জানিনা কি হবে। আগেই বলেছিলাম এরকম কিছু করিস না যাতে পস্তাতে হয়। কিন্তু তুই কি আমার কোন কথা মাথায় নিস? অকারনে ঈশান স্যারের পিছনে পড়ে থাকিস সবসময়! এখন যা ভাগ্যে যা আছে সেগুলোই কুড়িয়ে নিয়ে আয়।

মিলির মুখ থেকে কয়টা তেঁতো কথা শুনে অহনা মন মরা করে হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ানের কেবিনের সামনে আসলো। কেবিনের ঠিক দরজার কাছে পৌঁছেই অহনা ঈশানের সাথে জোরে একটা টক্কর খেলো।
ঘুরেফিরে সেই অহনাকে দেখে ঈশান চিৎকার করে উঠল।
_”চোঁখে দেখতে পাও না তুমি? অন্ধ নাকি?
_”স্যার এই প্রশ্ন তো আমিও আপনাকে করতে পারি। আপনি কি চোঁখে দেখতে পান না?
_”মানে?
_”আবার মানে মানে করছেন কেন স্যার? দেখুন আমি না হয় চোঁখে দেখতে পাইনা, অন্ধ তাই আপনার সাথে ধাক্কা লেগে গেলো। কিন্তু আপনি তো চোখে দেখতে পান তবুও কেন আমার সাথে ধাক্কা লাগলো? তবে কি আপনিও অন্ধ?
_”তোমার সাথে কথা বলাটাই বেকার! বেয়াদব মেয়ে একটা!
_”স্যার এটা তো পুরনো কথা। একটা নতুন ডায়লগ বলুন প্লিজ! খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
_”শাট আপ! তোমার কি মনে হচ্ছে আমি তোমার সাথে ফাজলামি করার মুডে আছি?
_”আপনার কি মনে হচ্ছে স্যার আমি আপনার সাথে ফাইজলামি করার মুডে আছি?
_”আছোই তো। এছাড়া তুমি আর পারোটা কি?
_”দেখুন স্যার একদম উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না। আমি মোটেও ফাইজলামি করার মুডে নেই। আমি তো খুব ভয়ে আছি আরিয়ান স্যার হঠাৎ আমাকে কেন ডাকলেন তাই!
_”বাবা তোমাকেও ডেকেছেন?
_”জি। কিন্তু স্যার কি আপনাকেও ডেকেছেন?
_”আমাকে ডেকেছে বলেই তো আমি এখানে এসেছি। না হলে কি আমি তোমার মত এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই নাকি।
_”স্যার আপনি এখনো আমার পিছনে পড়ে আছেন?
আপনার কি কোন ডর ভয় বলতে কিছুই নেই?
_”কেন ডর ভয় থাকবে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত?
_”স্যার আমি কিন্তু আপনাকে চোর বা ডাকাত কিছুই বলিনি।
_”তাহলে ভয়ের কথা আসছে কোথা থেকে?
_”দেখুন স্যার এই মুহূর্তে আমার আর আপনার দুজনেরই খারাপ সময়! কারণ আমাদের দুজনকেই আরিয়ান স্যার ডেকেছেন। এখন বুঝতেই তো পারছেন আমাদের দু’জনকে আলাদা করে ডাকার নিশ্চয় কোন কারণ আছে!
_”কথাটা তুমি কিন্তু ভুল বলোনি। আচ্ছা আমাকে আর তোমাকে একসাথে ডাকার ঠিক কি কারণে হতে পারে?
_”সেকি স্যার আপনি এখনো কারণ টাই ধরতে পারেননি?
_”না পারিনি। তুমি বলো কি কারন?
_”আমার তো মনে হচ্ছে স্যার আমি যে ক্লাসে একটা কথা বলেছি না এটা হয়তো সেটারই রিএকশন!
_”হোয়াট? কি বলতে চাও তুমি?
_”স্যার,,,,,,,

অহনা কিছু বলার আগেই আরিয়ানের পিএ এসে উপস্থিত হলো ‌।
_”স্যার আপনাদের দুজনকে ভেতরে ডেকেছেন।
_”(ঈশান) দুজনকে একসাথে যেতে বলেছেন?
_”জি স্যার! আপনাদের দুজনকে একসাথেই যেতে বলেছেন।
_”(ঈশান) ঠিক আছে আপনি এখন আসুন!
আরিয়ানের পিএ চলে যাওয়ার পর ঈশান অহনার কাছে এগিয়ে আসলো।
_”অহনা আমি আশা করছি তুমি বাবার কাছে কোন উল্টোপাল্টা কথা বলবেনা!
_”আমি আবার কি উল্টোপাল্টা কথা বলি স্যার?
_”সেটাতো তুমিই সব থেকে বেশি ভালো জানো। কি যে গন্ডগোল পাকিয়ে রেখেছো!
_”স্যার আমি কোন গণ্ডগোল করিনি। আমি বেবির কথা বলেছি এটা কি গন্ডগোল?
_”দেখো অহনা বাবার কাছে তুমি,,,,

অহনা ঈশানের কথা কোন পাত্তা না দিয়ে কেবিনের গেট ধাক্কা দিতে লাগলো। কিন্তু ঈশান তখনো চিৎকার করেই যাচ্ছিল!
_”অহনা! আমার কথা শোনো।
_”দেখুন স্যার যা কথা হবে আরিয়ান স্যারের কেবিনেই হবে। আলাদা করে আপনার সাথে আমার কোন কথা নেই। মন চাইলে ভেতরে আসুন। না হলে আমি স্যারকে বলছি আপনি আসবেন না।
_”তোমাকে বলেছি আমি আসবো না?
_”ঠিক আছে তাহলে আসুন!

ঈশান আর অহনা দুজনেই কেবিনে ঢুকলো। অহনা কেবিনে ঢুকেই বাঁ’হাত টা পেটের উপর রেখে মুখটা কিছুটা বিকৃত করে রাখলো। অহনার এরকম দুরবস্থা দেখে আরিয়ান নিজের চেয়ার ছেড়ে অহনার কাছে এগিয়ে আসলো।
_”অহনা তুমি ঠিক আছো?
_”জি স্যার আমি ঠিক আছি!
_”নাও এই চেয়ারটাতে বসো!
অহনাকে একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে, আরিয়ান সেই চেয়ারে বরাবর আরেকটা চেয়ার রেখে অহনার মুখোমুখি হয়ে বসলো।
_”এখন বলো তোমার শরীর ঠিক আছে?
_”জি স্যার ঠিক আছে।
_”তোমাকে দেখে তো ঠিক লাগছে না। কোথাও কোনো যন্ত্রণা হচ্ছে?
আরিয়ানের এই প্রশ্নে অহনা ঈশানের দিকে একটু আড়চোখে তাকালো। তারপর ঈশান কে হালকা ভেংচি কেটে বলল,
_”জি স্যার পেটে খুব যন্ত্রণা হয়!
_”শুধু পেটে যন্ত্রণা হয়? নাকি মাঝে মাঝে গাঁ গুলায়?
_”স্যার দু’দিন ধরে একটু একটু গাঁ গুলাচ্ছে। কিছু খেতেও পারিনা।

অহনার কথা শুনে আরিয়ান ঈশানের দিকে তাকালো। কিন্তু ঈশান কে চুপ করে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান আবার অহনার দিকে ফিরলো।
_”অহনা আমি আজকে যা শুনেছি তা কি সত্যি?
_”স্যার আপনি কি শুনেছেন?
অহনার পাল্টা প্রশ্নে আরিয়ান কিছুটা জড়তা নিয়ে বলল,
_”আমি শুনেছি তুমি নাকি প্রেগন্যান্ট? আর সেটাও ঈশানের,,,,
আরিয়ান কথা শেষ করার আগেই অহনা জোরে জোরে কান্নার ভান করলো!
_”জি স্যার আপনি যা কিছু শুনেছেন সব সত্যি।
_”হ্যাঁ ঠিক আছে কান্না বন্ধ করো! আমাকে বলো এসব কিছু কিভাবে ঘটলো?
_”স্যার আপনি তো জানেনই আমার আর ঈশান স্যারের একটু ঝামেলা ছিলো। সেই ঝামেলা মেটাতে আমি আর ঈশান স্যার দুজন দুজনকে সরি বলেছিলাম।
_”সরি? ঈশান তোমাকে বলেছিল?
_”জি স্যার।শুধু তাই নয়। স্যার আমাকে বিয়ের প্রপোজালো করেছিলেন‌। আর তারপর সেদিনই আমি আর স্যার বিয়ে করে নিই।
_”বিয়ের কোন ডকুমেন্টস আছে?
_”না স্যার কোন ডকুমেন্টস নেই। আমরা যেদিন বিয়ে করি সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল। আর দুর্ঘটনাবশত ডকুমেন্টস বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়!
_”তাহলে আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো তুমি সত্যি কথা বলছো?
_”স্যার ডকুমেন্টস নেই তাতে কি আমার কাছে আমার কথার প্রমাণ আছে। আপনি স্যারের বডিগার্ডদের এনে জিজ্ঞাসা করুন স্যার আমাকে নিজের বাংলোতে ডেকে নিয়ে সময় কাটিয়েছেন কি না।
_”সত্যি ডাকবো?
_”জি স্যার ডাকুন!
আরিয়ান ঈশানের দুজন বডি গার্ডকে ডাকিয়ে আনলো। বডিগার্ডেরা আসার পর আরিয়ান অহনাকে বললো,
_”অহনা ভেবে বলো আমি কি ওদের কে জিজ্ঞাসা করবো?
_”হ্যাঁ স্যার করুন! আমার কোন সমস্যা নেই।
এবার আরিয়ান দুজন বডিগার্ড কে জিজ্ঞাসা করল,
_”ঈশান কি এই মেয়েটিকে নিয়ে বাংলোতে কখনো গিয়েছিল?
বডিগার্ডেরা আরিয়ানের কথার কোন উত্তর দিল না। বরং মাথা নিচু করে রাখল। আরিয়ান একটা প্রশ্ন পরপর তিনবার করল। কিন্তু ঘটনা আগের মতোই রইল। আরিয়ানকে হতাশ হতে দেখে অহনা বলল,
_”স্যার দেখেছেন চুপ করে আছে! নিজের বসের বিরুদ্ধে কি আর এতো সহজে সাক্ষী দেওয়া যায়!
আরিয়ান হাতে ইশারা করে অহনাকে থামিয়ে দিয়ে বডিগার্ডদের চলে যেতে বলল।

বডিগার্ডেরা চলে যাওয়ার পর আরিয়ান ঈশানের কাছে এগিয়ে আসলো। তারপর কিছুটা হতাশ গলায় বলল,
_”ঈশান তোমার থেকে এসব ঘটনা আশা করা যায় না। তুমি চাইলে আমাকে বলতেই পারতে। আমি কি তোমাকে না বলে দিতাম?
_”বাবা,,,,
_”শোনো ঈশান ছোট থেকে আমি তোমাকে বন্ধুর মতো করে বড় করেছি। আমি যে তোমার বাবা সেটা কখনোই নিজের কাজে কর্মে প্রকাশ করিনি। কিন্তু তুমি আমাকে কখনোই বন্ধুর মত ভাবলে না। আমার অজান্তে এতো কিছু করে বসে আছো‌।
ঈশান কিছু বলতে গেল কিন্তু আরিয়ান ঈশান কে থামিয়ে দিল। তারপর ঈশানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
_”দেখো যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তুমি চাইলেও সেটা আর কখন বদলাতে পারবে না। কিন্তু এখন তুমি বাবা হচ্ছো তোমারও তো অনেক দায়িত্ব আছে!
নিজেকে বদলাও ঈশান। তোমার নিজের সন্তানের মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করো। আর মেডিকেল নিয়ে ভেবো না। সেটা আমি সামলে নিচ্ছি। এখন ওকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাও।
_”হ্যাঁ কিন্তু বাবা তুমি আমার কথা,,,,,
_”আর কোন কিন্তু নয় ঈশান। ওকে নিয়ে এসো!
আর হ্যাঁ খুব সাবধানে। আমি এখন আসছি তোমার মাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতে হবে তো।
এসব বলতে বলতে আরিয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান চলে যাওয়ার পর ঈশান অহনার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঈশান রাগে এতটাই কাঁপছিল যে কথাই বলতে পারছিল না । ঈশান কে এভাবে রাগে কাঁপতে দেখে অহনা কটাক্ষ করে বলল,
_”স্যার তো দেখছি খুব রেগে আছেন!কোন ব্যাপার না আমি এক্ষুনি আপনার রাগ ঠান্ডা করে দিচ্ছি। এতটুকু বলেই অহনা ঈশানের হাতটা নিজের পেটের উপর চেপে ধরে রাখল।
_”দেখুন স্যার আমাদের বেবি আপনাকে ডাকছে! ইস কি কিউট রে বাবা বাবা বলছে! এরপরেও আপনি রেগে থাকতে পারবেন?
অহনার কথা শুনে ঈশান নিজের হাতটা এক ঝটকায় টেনে আনলো।
_”এসব তুমি কি শুরু করেছো? আর কেন করছো এরকম?
_”স্যার আপনাকে ভালোবাসি তাই!
_”শাট আপ! তোমার মুখ থেকে আমি একদম এসব শুনতে চাই না। ভালোবাসা ভালোবাসা ভালোবাসা! বোঝো তুমি ভালোবাসার মানে?
_”স্যার আপনি বুঝেন?
_”আমাকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। তুমি বরং তোমাকে নিয়েই ভাবো। আমার লাইফটা তুমি পুরো হেল করে দিচ্ছ!
_”স্যার নিজেকে নিয়ে ভাবছি বলেই তো আপনার লাইফ হেল হচ্ছে। যদি সাথে একটু আধটু আপনাকে নিয়েও ভাবতাম তাহলে কিন্তু আপনার লাইফটা হেল হতো না।
_”চুপ একদম চুপ! কি চাও তুমি আমার কাছে? বলো কি চাও!
_”আপনার পিন্ডি চটকাতে!
_”হোয়াট? পিন্ডি চটকাতে মানে?
_”মানে হলো স্যার!
ওই আপনার হাত পা ব্যথা করলে টিপে দিতে চাই। ওটা কেই পিন্ডি চটকানো বলে।
_”তুমি কেন এসব করছো? বাবা আমার কোন কথাই শুনছে না। তুমি জানো আল্ট্রা করালে যে তুমি ধরা পরে যাবে।
_”হ্যাঁ জানি। কিন্তু আমিতো আল্ট্রা করবো না।
_”আমি তোমাকে করাবো। আর সেটাও জোর করে।
ঈশান এতটুকু বলতেই আরিয়ান ভেতরে ঢুকলো।
_”কি ব্যাপার ইশান কি করাবে জোর করে?
_”একি বাবা তুমি? যাওনি এখনও বাড়ি?
_”চলেই যাচ্ছিলাম কিন্তু ফোনটা ফেলে গেছি এখানে। তাই ওটাই নিতে আসলাম। এখন বলো তুমি জোর করে কি করবে বলছিলে?
ঈশান কিছু বলার আগেই অহনা জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল! অহনাকে কাঁদতে দেখে আরিয়ান অহনার কাছে এগিয়ে আসলো।
_”কি ব্যাপার অহনা কি হয়েছে? আর তুমি এভাবে কাঁদছো কেন? সব ঠিক আছে তো?
_”স্যার কিছুই ঠিক নেই।
_”কেন কি হয়েছে?
_”ঈশান স্যার আমাকে বেবি এবরশন করার জন্য ফোর্স করছেন! আমি মানছি না বলে জোর করে করবেন বলে হুমকিও দিচ্ছেন!
_”হোয়াট? ঈশান তুমি এসব কি শুরু করেছো? তোমার প্রথম ভুল আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু এক ভুলে উপর তুমি যত ভুল করবে আমি একটাও মানবো না।
অহনা তুমি চলো আমার সাথে!

অহনা চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়লো।
_”কি হলো বসে পড়লে যে? কোন সমস্যা হচ্ছে?
_”স্যার খুব দুর্বল লাগছে। দাঁড়াতেই পারছিনা।
_”কোন ব্যাপার নয়। এ সময় এরকম দুর্বলতা হয়েই থাকে!
ঈশান তুমি এদিকে এসো। ওকে একটু সাহায্য করো!
_”আমি আবার কিভাবে সাহায্য করবো?
_”কিভাবে সাহায্য করবে এখন এটাও তোমাকে আমার শিখিয়ে দেওয়া লাগবে?

ঈশান কিছুক্ষণ আরিয়ানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো। তারপরে এগিয়ে এসে অহনাকে কোলে তুলে নিলো।

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।