দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৪

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৪

ঈশানের কথা শুনে অহনা দেয়ালে লটকে থাকা ঘড়ির দিকে তাকালো। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় সাড়ে বারোটা বাজতে শুরু করেছে।
_”স্যার এখন তো অনেক রাত।
_”সো হোয়াট?আমি গাড়ি নিয়ে তোমার বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করছি। এখন তুমি সিদ্ধান্ত নাও আজকের বাকি মুহূর্ত গুলো আমাকে দিবে নাকি না?
_”স্যার আমি উঠে দাঁড়াতেও পারছি না।
_”তাহলে তুমি আসবেনা?????
_”হুম ঠিক আছে আসছি।
_”ওকে ফোন রাখছি বাই!

ঈশান ফোন রাখার পর অহনা পা টিপে টিপে লিভিং রুমের দিকে গেল। নিজের শরীরের ভারটা সহ্য করার ক্ষমতাও অহনার নেই। মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতার কারণে ভারসাম্য রাখতে না পেরে অহনা সোফায় বসে পরলো।

কয়েকবার উঠতে চেষ্টা করলো অহনা। কিন্তু শক্তিতে কুলাতে পারলো না। অহনা দু’মিনিট ভালো করে দম নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু হেঁটে দরজা পেরোবার আগেই কেউ একজন অহনার কাঁধে স্পর্শ করলো। অহনা ঘাবড়ে পিছনে তাকাতেই দেখলো তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে।

বাবাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অহনা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
_”একি বাবা ঘুমাওনি?
_”কিভাবে ঘুমাই বল! তোর জন্য যে বড় দুশ্চিন্তা হয়।
_”আমার আবার কি হলো?
_”আজকে সারাটা দিন তুই কেমন মনমড়া হয়ে ছিলি। মুখে না বললেও তোর মনের অবস্থা তো আমি ঠিকই বুঝতে পারি।
_”এখন যাও শুয়ে পড়ো!
_”বাবুর কাছে যাচ্ছিস?
_”কি করবো বলো বাবা! তোমার ভাগিনা,,,
_”তোকে আর কিছু বলতে হবেনা। আমি জানি ছেলেটার খুব জেদ! নিজে যা চাইবে সেটাই করবে। অন্যের চাওয়াতে তার কোন মাথাব্যথা নেই।
_”হুম বাবা।কেন যে এমন করে মানুষ টা!
_”শোন মা! এখন তোর কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব। বাবুর বিষাক্ত মনোভাব তোকেই বদলাতে হবে। আমার বোনটাকে ও খুব ভুল বুঝে আছে! সবকিছু তোর ঠিক করতে হবে।
_”বাবা তুমি এসব নিয়ে একদম ভেবোনা। আমিতো আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।
_”জানি না! এখন যা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়! না হলে বাবু আবার রেগে যাবে।
_”কিন্তু বাবা-মা যদি জেগে আমাকে দেখতে,,,
_”কিচ্ছু হবে না। তুই যা তোর মাকে আমি সামলে নেবো।

অহনা বাবার থেকে বিদায় নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগোতে এগোতে বাড়ির পেছনের দিকে চলে আসলো। বাড়ির পেছনে পৌঁছে ঈশানের দিকে চোখ পড়তেই অহনা দাঁড়িয়ে পড়লো। ঈশান একটা রেড কালার শার্ট পরে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য মাঝে মাঝে বাঁ হাতের দিকে চেয়ে ঘড়িও দেখছে। হয়তো অহনার আসার সময় গুনতেই ব্যস্ত ঈশান!

অহনা এক সাইডে সরে দূর থেকে ঈশানকে দেখতে লাগলো। ঈশান কে অস্থির চিত্তে এদিক ওদিক তাকাতে দেখে অহনা মনে মনে ভাবতে লাগলো,
_”মানুষটা বড়ই অদ্ভুত!মনের অজান্তেই উনি কারো জন্য অপেক্ষা করতে করতে অস্থির হয়ে উঠছেন।অথচ এই অস্থির হয়ে ওঠার কারণটাই কখনো খোঁজার চেষ্টা করছেন না। ঈশান স্যার নিজেও জানেন না অপেক্ষার এই অস্থিরচিত্ত উনার চেহারায় ফুটে উঠায় উনাকে কতটা সুন্দর লাগছে!
এসব ভাবতে ভাবতে অহনা ঈশানের সামনে এসে দাঁড়ালো। অহনাকে দেখামাত্রই ঈশান একটা ধাক্কা খেলো।

_”কি ব্যাপার এই শার্ট এখনো চেঞ্জ করোনি?
_”না করা হয়নি।
_”কেন?
_”মন চাইছিলো না তাই।
_”এটা আবার কোন ধরনের কথা?
_’এই ধরনেরই কথা।
_”হেঁয়ালি না করে বলো কেন শার্ট চেঞ্জ করো নি?
_”স্যার শার্ট চেঞ্জ করে ফেললে যে আপনার গাঁয়ের সুন্দর স্মেল টা হারিয়ে ফেলতাম!
_”ও তাহলে স্মেল হারানোর ভয়েই বুঝি রিজওয়ানের শার্টটা পরেই চলে এসেছিলে তাই না?
_”স্যার এটা কিন্তু ঠিক নয়! আজকে সকালে কিন্তু আমাদের কথা হয়ে গেছে এ বিষয় নিয়ে আমরা আর ঝগড়া করবো না। তাহলে আপনি কেন,,,
_”ওকে ফাইন! এবার গাড়িতে উঠো।

অহনা গাড়িতে উঠে বসলো। এবারও ঈশান নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে। ঈশান কে ড্রাইভিং করতে দেখে অহনা বলল,
_”আচ্ছা স্যার লন্ডনে কি আপনি সত্যি সত্যি পড়াশোনা করেছেন?
_”হোয়াট? তাহলে তোমার কি মনে হয় আমি ওখানে ডান্স করেছি?
_”না স্যার। আমি ঠিক সেটা বলছি না। আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় কি আপনি লন্ডনে ড্রাইভিং শিখতে গিয়েছিলেন।
_”এইসব আজগুবি কথা মনে হওয়ার মানে কি?
_”স্যার মানেটা হল আপনি ক্লাস করানোর থেকেও ড্রাইভিং টা বেশি ভালো করেন!
_”কেউ ড্রাইভিং ভালো পারলেই যে সে বিদেশ ড্রাইভিং শিখতে গেছে এটা তুমি কোথায় পেলে?
_”সরি স্যার! এমনি বললাম।
_”হ্যাঁ ঠিক আছে এবার গাড়ি থেকে নামো। চলে এসেছি।

অহনা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
_”স্যার এটা কোথায়?
_”কোথায় আবার? বললে চিনবে তুমি?
_”সেটা নয় স্যার। আমি জানতে চাচ্ছি আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছেন?
_”রিজওয়ানের গ্রীনহাউজ দেখেছ আমার ড্রিম হাউজ দেখবে না? ভেতরে চলো!
অহনা ঈশানের পিছনে পিছনে বাংলাতে প্রবেশ করলো। রিজওয়ানের গ্রীনহাউজ থেকেও বেশি সুন্দর ঈশানের ড্রিম হাউজ ! অহনা ভেতরে ঢুকেই বসে পড়লো। অহনা কে এভাবে হুট করে বসে যেতে দেখে ঈশান বলল,
_”কি হল বসে পরলে যে?
_”স্যার শরীরটা এমনিতেই ভীষণ দুর্বল!আপনার এত সুন্দর ড্রিম হাউজ দেখে আমি আর সহ্য করতে পারছি না!
_”হুম চলো!
_”কোথায় যাব স্যার?
_”চলো,,,,,,

অহনা আর কোন প্রশ্ন না করে ঈশানের পিছু পিছু চলতে শুরু করলো। ঈশান অহনাকে নিয়ে বাংলোর ছাদে উঠলো। অহনা ঈশানকে বাংলাতে ঢুকেই ছাদে উঠার কারন জিজ্ঞাসা করতে উদ্যত হল, কিন্তু তার আগেই ঈশান অহনাকে আকাশের দিকে হাত ইশারা করে বললো,
_”দেখেছ ফুল মুন?
অহনা ফুল মুন দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো!
_”স্যার আপনি সত্যিই খুব ভালো! এত বড় চাঁদ এর আগে কখনোই দেখা হয়নি!
_”ভালো লাগছে তোমার?
_”স্যার খুব ভালো লাগছে!
_”জ্বর আছে নাকি সেরে গেছে?
_”স্যার মন তো ভালো হয়ে গেছে। এখন হয়তো জ্বরও সেরে যাবে।
_”চাঁদকে ভালো লাগে তোমার?
_”হ্যাঁ স্যার খুব ভালো লাগে!
_”আর ঈশান কে?

ঈশানের এই অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে অহনা চাঁদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঈশানের দিকে তাকালো।
_”কি বললেন স্যার?
_”শুনতে পাওনি?
_”না। আবার বলুন!
_”ঈশান এক কথা দুই বার বলে না।
_”জানি স্যার কিন্তু আমিতো,,
_”চাঁদ দেখা হয়ে গেছে তো। চলো নিচে চলে যাই।

ঈশান অহনাকে নিয়ে নিচে নেমে আসলো। রুমে এসে অহনা ঈশান কে বলল,
_”স্যার বাড়ি দিয়ে আসবেন না আমাকে?
_”বাড়ি যাবে?
_”জি।
_”কেন এখানে থাকা যায়না?
_”এখানে,,,?
_”কেন আমাকে বিশ্বাস করো না তুমি?
_”স্যার আপনি কিসের বিশ্বাসের কথা বলছেন?
_”বুঝতে পারোনি?
_”না সত্যিই বুঝতে পারিনি। কিসের বিশ্বাস?
_”যে বিশ্বাসের ভয়ে তুমি পালাতে চাইছো।
_”স্যার আমি তো পালাতে চাই নি।
_”ঠিক আছে তাহলে থাকবে আমার সাথে?
_”স্যার,,,,,,
_”অন্যকিছু হবে না প্রমিস করছি! কারণ আমি জানি তোমার মনটা অন্য কারো।
_”এসব আপনি কি বলছেন স্যার? আমার মন কেন,,,
_”অহনা থাক এসব কথা!নিজের চোঁখ, কান এসব কি অন্য কারো মুখের কথা কে বিশ্বাস করে?

অহনা ঈশানের কথার কোন উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়লো। তবে অহনার মাথায় ঈশানের বলা কথাগুলো ঘুরপাক খেতে লাগলো। কিন্তু ঈশানের এই উদ্ভূত কথাগুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না অহনা। সারারাত এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়ে দিলো অহনা। ভোর চারটা বাজতেই বাহিরের দমকা বাতাস ঢুকে ঘর এলোমেলো করে দেওয়ার উপক্রম হলো। আর ঠিক কিছুক্ষণ বাদেই বৃষ্টি হতে শুরু করলো।

চারপাশের এই ঠান্ডা উষ্ণতায় অহনা উঠে বসলো। উঠে বসা মাত্রই অহনার চোখ পড়ল সোফায় ঘুমিয়ে থাকা ঈশানের দিকে। ডিম লাইটের আবছা আবছা আলোয় ইশানের রাগী মুখটাকে অসম্ভব নিষ্পাপ লাগছে!
ঈশান কে একটু আঁটসাঁট হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে অহনা একটা ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে ঈশানের কাছে এগিয়ে গেল।

ঈশানের গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে ‌অহনা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। কিন্তু ফিরে আসার সময় অহনার ওড়না ঈশান মুখে পড়ার কারণে ঈশানের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙ্গে অহনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশান উঠে বসে পড়লো।
_”কি ব্যাপার তুমি এখানে?
_”না স্যার বাইরে খুব ঠান্ডা! তাই আপনাকে ব্ল্যাঙ্কেট,,,
_”এটা কি সিনেমা পেয়েছো?
_”স্যার এসব আপনি কি বলছেন?
_”শোনো সিনেমাতে নায়িকা এসে নায়ক এর গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট দিলে নায়ক-নায়িকাকে জড়িয়ে ধরে। বাস্তবে নয় বুঝেছো?
_”স্যার আমার এমন কোন মতলব নেই। আমি শুধু আপনাকে,,,,
_”ওয়েট ওয়েট ওয়েট তুমি কি চান্স নিতে চাইছো? একজন ঘুমন্ত মানুষের থেকে চান্স নেওয়া কি উচিত?

অহনা আর কোন উত্তর না দিয়ে রাগ করে চলে গেল। অহনাকে চলে যেতে দেখে ঈশান নিজের ফোন টিপতে শুরু করলো। আর অন্যদিকে বৃষ্টির দাপট বেড়েই চলেছে। আগের থেকেও দ্বিগুণ ঝেঁপে বৃষ্টি পরতে দেখে অহনা দৌড়ে এসে ঈশানের হাত ধরলো।
_”চলুন!
_”কোথায়?
_”কোথায় আবার কি? ছাদে চলুন!
_”কিন্তু বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে।
_”তাতে কি স্যার? বৃষ্টিতে ভিজবো দুজনে।

ঈশান অহনাকে বাঁধা দিতে চাইলো। কিন্তু অহনা ঈশানের হাত ধরে টানতে টানতে ছাদের মধ্যে নিয়ে চলে আসলো। বৃষ্টির ঝড়ো ফোটা অহনা ঈশান দু’জনকেই ভিজিয়ে একাকার করে দিলো।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অহনা গুনগুন করে গাইতে লাগলো,

“এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকেনাতো মন,
কাছে যাবো কবে পাবো ওগো তোমার নিমন্ত্রণ।”

অহনাকে গান গাইতে দেখে ঈশান অহনার অনেক কাছে এগিয়ে আসলো ,
_”বাহ্ গানও গাইতে পারো?
ঈশানের প্রশ্নে অহনা হেসে দিলো। কিন্তু তারপর অহনা যা বলল তাতে ঈশান মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা।
_”স্যার আমাকে কোলে তুলে নিন না!
_”কি?
_”শুনতে পাননি?
_”না ।
_”মিসেস ঈশান এক কথা দুই বার বলে না।
ঈশান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে অহনাকে কোলে তুলে নিলো।

_”কোলে যে উঠেছো যদি অন্য কিছু হয়ে যায় তাহলে কিন্তু আমার কোন দোষ নেই।
_”কি হবে আবার?
_” যাই আছে নিলাম তো কোলে। বলো কেন উঠতে চাইলে?
_”একটা হবে?
_”কি?
_”দুজনের প্রেমের কাহিনী!

ঈশান কোন উত্তর না দিয়ে মুখ মলিন করে অহনাকে নিয়ে নিচে নেমে আসলো।যদিও অহনা বুঝতে পারলো না ঈশানের মুখ মলিন হওয়ার কারণ।
অহনাকে রুমে এসে নামিয়ে দিয়ে ঈশান বলল,
_”তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নাও! এমনিতেই জ্বর বাধিয়ে রেখেছো। আর এখন বৃষ্টিতে ভিজলে। কি অবস্থা হবে তোমার একবার ভেবে দেখো!
_”আমার কিছু হলে আপনার কি? আপনার তো কিছুই না ‌। আমার জন্য তো আপনার কোন মায়াও নেই।
_”আমার কিছু না হলেও মেডিকেলের অনেক কিছু।
_”ও তাইতো। আমাকে তো আবার মেডিকেলের বুয়ার কাজ করতে হবে।
_”আমি কিন্তু সেটা বুঝাই নি।
_”থাক স্যার শাঁক দিয়ে কই মাছ ঢাকতে হবে না। আমি সবই বুঝতে পারি।
_”এত যে মায়া মায়া করছো, তোমার কোন মায়া আছে আমার জন্য?
_”মায়া নেই?
_”না নেই। যদি থাকতো তাহলে সেদিন রিজওয়ানের বডিগার্ডদের আমাকে ওভাবে মারতে বলতে না।

ঈশানের কথা শুনে অহনা ধীরে ধীরে ঈশানের কাছে এগিয়ে আসলো। তারপর দুই হাত দিয়ে আলতো করে ঈশানের মুখটা নিচের দিকে টেনে নামিয়ে বলল,
_”আপনি নিজ কানে শুনেছেন আমি আপনাকে মারতে বলেছি? বলুন!
_”না।
_”শুনেননি আর কখনো শুনবেন ও না। কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি!
অহনার কথা শুনে ঈশান নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলো না। নিজের অজান্তেই অহনার,,,,,,,,

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।