দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৩

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১৩

তুমিতো অহনাকে ভালোবাসো তাই না? আর মীরার সাথে,,,!
_”শাট আপ! একদম খারাপ কথা বলবেনা!
না আমি অহনা কে ভালবাসি আর না মীরাকে ভালোবাসি।

ঈশান এতোটুকু বলার সময় অহনার জ্ঞান ফিরে আসলো। ফলে অহনা শুধুমাত্র ‘মীরাকে ভালোবাসি’ এতটুকুই শুনতে পেলো!
অহনার জ্ঞান ফিরে আসতেই ঈশান ছুটে যায় অহনার কাছে।

_”অহনা এখন কেমন লাগছে?ঠিক আছো তুমি?
অহনা মুখে কোন কথা না বলে শুধু মাথা নাড়লো।
অহনা কে কোন কথা না বলতে দেখে ঈশান নিজেই বললো,
_”তোমার শরীর এতো টা খারাপ সেটা আমাকে আগেও বলতে পারতে।তাহলে তো তোমাকে আর,,,
ঈশান কথা শেষ করার আগেই রিজওয়ান বলে উঠলো,
_”কষ্ট দিতে না তাই তো ভাইয়া?
_”সে কথা তোমাকে বলতে হবে?
_”না শুনি একটু!
_”সেটার কোন প্রয়োজন নেই। আর হ্যাঁ তুমি দুজনের মাঝখানে থার্ড পারসন হয়ে কেন ঢুকছো? এই রাইট তো তোমার নেই।
_”কেন রাইট থাকবে না ভাইয়া? অহনা কি তোমার পার্সোনাল প্রপার্টি নাকি?
_”শাট আপ! আমি বলেছি অহনা আমার পার্সোনাল প্রপার্টি? আগ বাড়িয়ে ফালতু কথা না বললে হয় না!

দুজনকে এভাবে তুমুল পর্যায়ের কথা কাটাকাটি করতে দেখে অহনা ধীরেসুস্থে বলল,
_”অপনারা থামুন প্লিজ! এসব চিৎকার-চেঁচামেচি আমার সহ্য হচ্ছে না।
অহনার অনুরোধে ঈশান আর রিজওয়ান দুজনেই থেমে গেল। রিজওয়ান একবার অহনার দিকে তাকালো। তারপর কেবিন থেকে বের হয়ে চলে গেল। রিজওয়ান চলে যাওয়ার পর অহনা ঈশান কে বলল,
_” আমাকে একটু বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দিন! আমি বাড়ি যেতে চাই।
অহনার কথা শুনে ঈশান এগিয়ে আসলো।
_”তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এখন এই অবস্থায় তুমি কিভাবে বাড়ি যাবে?
_”কিন্তু স্যার বাড়ি না গেলে আমি কিভাবে রেস্ট করবো? আমার বসে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে!
আমি আর কিছুতেই বসে থাকতে পারছিনা।
_”হুম তাহলে মিসেস ঈশান এতো বিশাল মেডিকেল রেখে রেস্ট করার জন্য বাড়ি যেতে চাইছেন!একথা বলতে বলতেই ঈশান অহনাকে চেয়ার থেকে কোলে তুলে নিলো। ঈশান কে এভাবে হঠাৎ করে কোলে উঠাতে দেখে অহনা বললো,

_”স্যার কি করছেন?
_”নিয়ে যাচ্ছি।
_”কিন্তু কোথায়?
_”কোথায় আবার রেস্ট করাতে।
_”কিন্তু স্যার এভাবে সবার সামনে দিয়ে,,,
_”সো হোয়াট? আমি আমার ওয়াইফকে কোলে তুলেছি তাতে কার কি?
_”কিন্তু স্যার একথা তো কেউ জানে না।
_”তুমি আর আমি তো জানি। এটা যথেষ্ট নয়?
_”স্যার!,,,,
_”কি? বলো!
চুপ করে গেলে কেন?
_”না কিছু না।
_”বললে বলো। না হলে নিচে ফেলে দিবো। তারপর তো বুঝতেই পারছো সবাই তোমাকে কোমর ভাঙ্গা মিস স্কলার্শিপ ডাকবে। ভালো লাগবে?
_”না স্যার একদম না।
_”তাহলে বলো একটু আগে কি বলছিলে?
_”বলেছিলাম ,স্যার আপনাকে না মাঝে মাঝে খুব অচেনা লাগে!
_”গতকাল রাতে তোমাকেও আমার খুব অচেনা লেগেছিল!
_”কিন্তু স্যার,,,
_”আর কোন কথা নয়।
এতোটুকু বলেই ঈশান অহনাকে কোলে করে কেবিনের বাইরে বেরোলো। ঈশান বের হওয়ামাত্রই বডিগার্ডরা সবাই নড়ে চড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।অহনা চেনা-পরিচিত বডিগার্ডদের থেকে নিজেকে লুকানোর জন্য ঈশানের বুকে মুখ লুকানোর চেষ্টা করলো।

ঈশান লিফটের কাছে আসতেই একজন বডিগার্ড এসে লিস্ট ওপেন করলো।
_”স্যার আমরা আপনার সাথে আসবো?
_”না। সেটার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমরা কেবিনের কাছেই থাকো।
_”ওকে স্যার! কত নাম্বার ফ্লোরে যাবেন আমি ,,,,
_”তুমি যাও। আমি ঠিক করে নিচ্ছি।

লিফটের দরজা বন্ধ হওয়া মাত্রই অহনা ইশানের বুক থেকে নিজের লুকোনো মুখটা উপরে তুলল।
_”স্যার আমরা কত নম্বর ফ্লোরে যাচ্ছি?
_”টুয়েন্টিফোর্থ ফ্লোরে।
_”কিন্তু স্যার ওটা তো আপনার জন্য বুক করা হয়েছে। মানে এক হিসেবে ওটা আপনার হোমের মতোই।
_”হ্যাঁ। সেজন্যই তো তোমাকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছি। যেন তুমি রেস্ট করতে পারো।
_”স্যার ওখানে তো আর কেউ যায় না।
_”সো হোয়াট?
_”না মানে স্যার,,,,,
_”ভয় পাচ্ছো?

অহনা কোন উত্তর না দিয়ে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। ঈশানও আর কিছু বলল না। টুয়েন্টিফোর্থ ফ্লোরে পৌঁছে ঈশান নিজের জন্য বুক করা রুমে প্রবেশ করলো। পুরো রুম অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে! অহনা হাঁ করে তাকিয়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকে। অহনার এরকম অদ্ভুত চাহনি দেখে ঈশান বলল,
_”কি দেখছো?
_”স্যার রুমটা।
_”কি?
_”খুব সুন্দর!
_”জীবন এতো সুন্দর রুম দেখনি?
_”স্যার সেরকম কোনো ব্যাপার না। আসলে,,,
_”থাক আর বলতে হবে না।
ঈশান অহনাকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল।
_”নাও রেস্ট করো!
_”স্যার কিসের জন্য?
_”কিসের জন্য মানে? তুমিই তো বললে রেস্ট করতে চাও।
_”হ্যাঁ স্যার।
_”ভুলে গেছিলে তাই তো?
_”না স্যার। ওই আর কি,,,,
_”আমার রুমে ঢুকতেই তোমাকে কেউ অদৃশ্যভাবে রেস্ট করিয়ে দিয়েছে এই আর কি তাইনা?
_”স্যার!,,,,
_”আমি অবাক হচ্ছি নাতো অহনা! কারন এটাতে আমি অভ্যস্ত আছি। কয়েক মাস আগেও তো তুমি আমার কাছে একটা পড়া বুঝতে গিয়েছিলে। আর তারপর আমার কেবিনে গিয়ে বসা মাত্রই এক অদৃশ্য শক্তি এসে তোমাকে সেই পড়াটা বুঝিয়ে দিয়েছিল তাই না?
তার মানে আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমার রুমে ঢোকা মাত্রই এক অদৃশ্য শক্তি এসে হয়তো তোমাকে রেস্ট করিয়ে দিয়ে গেছে। তাই তুমি রেস্ট এর কথা ভুলেই গেছো।

অহনা লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো। কারণ অহনা খুব ভালো করেই জানে ঈশানের সাথে এই মুহূর্তে কথায় পারা মুশকিল!
অহনাকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে ঈশান বলল,
_”আচ্ছা ছাড়ো! এখন বলো কি খাবে তুমি?
_”না স্যার। আমি কিছু খাবো না।
_”কেন খাবে না? তুমি বলো কি খেতে চাও আমি অর্ডার করে দিচ্ছি।
_”কোন প্রয়োজন নেই স্যার। অযথা টাকা খরচ।
_”ওয়েট ওয়েট ওয়েট! কি বললে অযথা টাকা খরচ? তারমানে তুমি আমার টাকা-পয়সা নিয়ে ভাবো? শোনো ঈশান খান যেমনই হোক না কেন নিজের ওয়াইফকে না খাইয়ে রাখবে না বুঝেছো!

এতোটুকু বলেই ঈশান অর্ডার করার জন্য এগুতে নিল। কিন্তু তার আগেই অহনা ঈশানের হাত ধরে ফেলল।
_”কি হলো হাত ধরলে যে?
_”স্যার! আপনি আমাকে নিজের ওয়াইফ বললেন?
_”কেন শুনতে পাওনি?
_”শুনেছি।
_”তাহলে প্রশ্ন করছো কেন?
_”মানেন আমাকে নিজের ওয়াইফ?
_”অহনা তোমার আমার মেনে নেওয়ায় কিংবা না মেনে নেওয়ায় কি সম্পর্ক মিথ্যে হয়ে যাবে?

অহনা কিছু না বলে ঈশানের হাত টা ছেড়ে দিল। মিনিট দশেক পরেই ঈশান অহনার জন্য খাবার নিয়ে হাজির হলো। ঈশানের হাতে খাবার দেখে অহনা বলল,
_”স্যার আপনি অযথা কষ্ট করলেন।
_”কে বলেছে তোমাকে আমি কষ্ট করেছি?
_”খাবার আনতে যাওয়া এটা কি কষ্ট নয়?
_”আমি তো খাবার আনতে যায়নি। অর্ডার করে দিয়েছি। গার্ড এসে দিয়ে গেছে।
_”ঠিক আছে।
_”খাবার খেয়ে নাও।
_”আপনি খাবেন না স্যার?
_”না।
_”আপনি না খেলে আমিও খাবো না।
_”আমার জন্য তোমার কোন ফিলিংস আছে?
_”কেন থাকবে না? কয়েক হাজার গুন বেশি ফিলিংস আছে আপনার জন্য!
_”তাই নাকি? তাহলে দেখাও!
_”এসব আবার কিভাবে দেখায়?
_”জানিনা। মন চাইলে দেখাও।
না মন চাইলে দেখাতে হবে না।

অহনা কিছুক্ষণ ঈশানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর একটুকরো রুটি হালকা করে ঝোলে ভিজিয়ে ঈশানের মুখের কাছে ধরলো।
_”নিন হাঁ করুন!
_”এটা কি করছো?
_”একটু আগে না আমার ফিলিংস দেখতে চাইলেন। তাই ফিলিংস দেখাচ্ছি।

ঈশান অহনার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কেনো যেনো এই অদ্ভুত চাহনি দেখে অহনার মনে হচ্ছে ঈশানের ভেতরে হাজার হাজার কষ্টের পাহাড় লুকিয়ে আছে! অহনা হাতে থাকা টুকরো রুটি টা ঈশানের আরো কাছে নিলো। কিন্তু ঈশান সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো।
_”কি হলো স্যার? খাবেন না?
অহনা দু’বার বললো কথাটা কিন্তু ঈশান কোন উত্তর দিলো না। যখন অহনা তৃতীয়বার একই কথা বলল। তখন ঈশান কিছুটা ভারী গলায় বলল,
_”খুব কষ্ট হচ্ছে!

ঈশানের কথা শুনে অহনা সামনে থাকা সব খাবার গুলো এক সাইডে সরিয়ে দিল। তারপর ঈশানের মুখটা নিজের দিকে টানতেই ঈশান অহনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। ঈশানের এরকম অদ্ভুত কাজ দেখে অহনা প্রথম দিকে একটু চমকে উঠলো! তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে ঈশানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অহনা বলল,
_”স্যার কিসের এত কষ্ট হচ্ছে?
_”জানিনা। তবে হয়তো ২০ বছর আগেও কেউ এভাবে মুখের সামনে খাবার এনে দিতো। যেভাবে আজ তুমি দিলে।
ঈশানের কথা শুনে অহনার খুব কষ্ট হতে লাগলো। ঈশান কে অহনা সান্ত্বনা স্বরূপ কিছু একটা বলতে গেল কিন্তু তার আগেই ঈশান লাফ দিয়ে উঠে বসে বলল,
_”অহনা তোমার কাপড়ে হয়তো স্প্রিট লেগে আছে।
_”জি। ওই সিঁড়ি মোছার জন্য পানিতে স্প্রিট মিশিয়ে দিয়েছিলাম। সেটাই কাপড়ে লেগেছে।
_”হুম বুঝতে পেরেছি। কাপড় টা চেঞ্জ করে নাও! এই কাপড়টা পড়ে থাকা ঠিক হবে না।
_”কিন্তু স্যার এই মুহূর্তে আমি কাপড় কোথায় পাবো।
_”একটু সময় দাও !আমি তোমার জন্য বরং একটা কাপড় কিনে নিয়ে আসছি।
_”এটা তো একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। আপনি বরং কষ্ট করে একটু মিলিকে খবর দিয়ে দেন। আমি ওকে বলে দিচ্ছি আমার কাপড় বাড়ি থেকে এনে দিতে। কিংবা স্যার আমিতো একটু পরেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। না হয় বাড়ি গিয়ে চেঞ্জ করে নিবো।

ঈশান একবার অহনার দিকে তাকালো। তারপর নিজের সাদা শার্ট টা খুলে অহনার হাতে দিয়ে বলল,
_”এটা পরে নাও!
_”না আমি এটা পরবো না।
_”কেন? আমার শার্ট পরতে তোমার অসুবিধে আছে বুঝি?
_”সেটা নয়।
_”তাহলে?
_”অন্যের লিপস্টিক লেগে থাকা শার্ট আমাকে পরতে দিলেন?
_”অহনা লিপস্টিক টা যারই হোক না কেন। শার্ট টা কিন্তু আমারই। নাও পরে এসো! ঈশান একটা টাওয়াল অহনার হাতে দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পরলো।

অহনাও আর কোন কথা না বাড়িয়ে গোসল করে ঈশানের শার্ট টা পরে নিলো। অহনাকে গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরোতে দেখে ঈশান দাঁড়িয়ে গেল।
অহনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে, ঈশান অহনার কাছে এগিয়ে আসলো।
_”হুম এই শার্টে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে! আজকে সকালে যে শার্ট টা পরেছিলে না? ওটাতে তোমাকে পুরো শাকচুন্নির মতো দেখা যাচ্ছিলো!
_”কিসের মত?
_”কিসের মত আবার? শাকচুন্নির মত।
_”স্যার আপনি শাকচুন্নি চেনেন?
_”না মানে,_
_”মানে কি স্যার?
_”ওই পরশু রাতে একটা কার্টুনে দেখেছিলাম।
ঈশানের কথা শুনে অহনা জোরে জোরে হাসতে শুরু করে দিলো।
_”কি? স্যার আপনি কার্টুন দেখেন?
অহনার এরকম প্রশ্নে ঈশান কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেলো। ঈশান কে লজ্জা পেতে দেখে অহনা এ বিষয় নিয়ে আর কোন কথা বলল না।

*বিকেল বেলা বাড়ি যাওয়ার জন্যে অহনা ঈশানের কাছে গেল।
_”স্যার! আপনি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন?
_”এখন যাবে?
_”জি!
_”ঠিক আছে চলো।

ঈশান অহনাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। ঈশান কে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেখে অহনা অবাক হয়ে বললো,
_”স্যার আপনি ড্রাইভিং করবেন?
_”হ্যাঁ। কেন আমি ড্রাইভিং করতে পারিনা?
_”না সেটা বলছি না। ড্রাইভিং তো করতেই পারেন। তবে বেশিরভাগ সময় তো ড্রাইভারকে সাথে নেন তাই আরকি।
_”না হয় আজকে তোমার জন্য আমিই,,,,,,
_”কি স্যার?
_”কিছু না।
ঈশান গাড়ি নিয়ে মেডিকেল থেকে বের হয়ে অহনার বাড়ির দিকে রওনা দিলো। পথিমধ্যে অহনা হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”ও মাই গড! আবারো ভুল হয়ে গেলো?
_”কি ভুল?
_”স্যার আমি আপনার শার্ট পরে চলে এসেছি।
_”সো হোয়াট? সারা রাত্রি বেলা নোংরামো করে রিজওয়ানের শার্ট পরে যদি বাড়ি যেতে পারো।তাহলে নিজের হাজবেন্ডের শার্ট পরে বাড়ি যেতে প্রবলেম কি?

_”দেখুন স্যার কারো শার্ট পরে বাড়ি যাওয়া মানেই যে সারা রাত্রি বেলা নোংরামো করা এটা ভুল কথা। আপনি কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন আপনার শার্টেও লিপস্টিক লেগেছিল। আর ওভাবে লিপস্টিক লেগে থাকা মানে যে কি সেটা কিন্তু আমি খুব ভাল করেই জানি।
অহনার কথা শুনে ঈশান জোরে গাড়ির ব্রেক কষলো। তারপর অহনার দিকে ফিরে তাকালো।

_”এই কি জানো তুমি ? বলো কি জানো?
_”বলতে পারবো না স্যার। এসব কি বলা যায় নাকি?
_”শাট আপ! একদম বাজে কথা বলবে না। শার্টে লিপস্টিকের দাগ থাকা মানেই‌ যে, জন্য কিছু করা এটা তুমি কোন ডিকশনারিতে পেয়েছো?
_”তাহলে স্যার অন্য কারো শার্ট পরে বাড়িতে আসা মানে যে, নোংরামো করা এটা আপনি কোন ডিকশনারিতে পেয়েছেন?

_”আমার সাথে তর্ক করছো? বেয়াদব মেয়ে একটা! সারা রাত্রি বেলা এক ছেলের সাথে এক ঘরে থেকে এসে আবার বড় বড় কথা!
_”স্যার সারারাত কিন্তু আপনিও মীরা ম্যামের বাড়িতে ছিলেন। আর দুজন এক ঘরেই ছিল।
_”প্রমাণ আছে তোমার কাছে এক ঘরে যে ছিলাম? কিন্তু আমার কাছে প্রমান আছে ।আমার এই দু’চোখ। আমি নিজ চোঁখে দেখেছি তোমাকে আর রিজওয়ান কে বাংলোর এক ঘরে ঢুকতে।
_”আমার কাছেও প্রমান আছে স্যার। আমার এই দু’চোখ। আমি নিজ চোঁখে আপনার শার্টে লিপস্টিক লেগে থাকতে দেখেছি। শুধু তাই নয় স্যার রংটা হুবহু মীরা ম্যামের ইউজ করা লিপস্টিকের মতো।

_”হ্যা ভালো হয়েছে। লিপস্টিকের রঙ শার্টে লেগেছে বেশ হয়েছে! তুমিতো একেবারে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে রিজওয়ানের কোলে করে গাড়িতে উঠে পড়লে। আবার আসছে আমার শার্টের রং দেখাতে।
_”শুনুন স্যার! আমি মোটেই নাচতে নাচতে কারো কোলে উঠিনি। সেই সময় আমার জ্ঞান ছিল না।
_”ও তাই নাকি মিস স্কলার্শিপ?
_”হ্যাঁ স্যার তাই।
_’তো কোনো প্রমাণ আছে সেই সময় যে, আপনার জ্ঞান ছিল না?
_”এটার প্রমাণ কিভাবে দিবো? আর হ্যাঁ স্যার আপনি এত প্রমাণ প্রমাণ কেনো করছেন?আপনিও তো মাঝরাস্তায় আমাকে ফেলে রেখে লাফাতে লাফাতে মীরা ম্যামের সাথে উনার বাড়ি চলে গেলেন।
_”হোয়াট? শোনো আমি কারো সাথে লাফাতে লাফাতে বাড়ি যাইনি। আমাকে যখন মীরা ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল তখন আমি সেন্সলেস ছিলাম।

_”ও আচ্ছা। তাহলে ঈশান স্যার বুঝি আজকাল সেন্সলেসও হন।
_”কেন হতে পারি না?
_”না হতে পারেন। তবে কোন প্রমাণ আছে সেন্সলেস যে হয়েছিলেন?
_”না। এটার আবার প্রমাণ হয় নাকি?
_”হুঁ ! আমারও প্রমাণ নেই আপনার ও প্রমাণ নেই। দুজনেই সমান সমান। তাই এই বিষয় নিয়ে আর কোন ঝগড়া হবে না। কি রাজি?

ঈশান অহনার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। তারপর হাসতে হাসতে সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। ঈশান কে এভাবে এই প্রথম হাসতে দেখে অহনার মুখ হাঁ হয়ে গেল। ইশানের হাসি থামার পরেও অহনা ঈশানের দিকে তাকিয়েই রইলো। অহনা কে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঈশান বলল,
_”কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?
_”স্যার আপনাকে দেখছি?
_”কি?
_”মনে হচ্ছে সামনে কোন সাক্ষাৎ রাজপুত্র বসে আছে! হাসলে আপনাকে এতো সুন্দর লাগে! অথচ আপনি মুখটা সব সময় কালা বাদুড়ের মতো করে রাখেন।
_”হোয়াট? কিসের মত করে রাখি?
_”না স্যার কিছু না। ওই এক ধরনের পাখি। আপনার মত! সহজে হাসেনা। তাই বললাম আর কি।

ঈশান আর কিছু বলল না। অহনাকে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে ঈশান চলে আসলো। বাড়িতে ঢুকেই অহনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বাবা-মায়ের মাঝে তুমুল ঝগড়া চলছে। ঝগড়ার কারণ অহনার মা বাবা বাড়ি যাওয়ায় তার অবর্তমানে অহনার বাবা তার জঘন্য ভাগিনার সাথে অহনার বিয়ে দিয়ে ফেলেছে।

অহনা ঘরে ঢুকতেই দুজনের ঝগড়া থেমে গেল। অহনাকে এভাবে শার্ট পরা দেখে অহনার মা এগিয়ে আসলো,
_”বাপরে বিয়ে করে‌ আবার বরের শার্ট পরেও ঘুরছিস?
_”মা তুমি যা ভাবছো সেরকম কিছুই না।
_”তাহলে কি? আমাকে এখন উল্টাপাল্টা বুঝাবি?
_”ধুর তোমার সাথে কথা বলে কে?
অহনা মায়ের সাথে কোন কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

অহনার শরীর ক্রমেই দুর্বল হতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই অহনা বুঝতে পারলো জ্বর আগের থেকেও দ্বিগুণ করে বাড়ছে। কিন্তু অহনা নিজের জ্বরের কথা বাবা, মা কিংবা বোন কাউকেই বলল না।
অহনা কে এরকম অবেলায় শুয়ে থাকতে দেখে সবাই খুব অবাক হলো! কিন্তু অহনার মন-মেজাজ দেখে কারো প্রশ্ন করার সাহস হলো না।

সন্ধ্যা শেষ করে রাত গভীর হতে শুরু করলো। কিন্তু অহনা কিছুতেই ঘুমোতে পারলো না। হঠাৎ অহনার ফোনে রিং বেজে উঠল। স্ক্রিনে না তাকিয়েই অহনা ফোন রিসিভ করে ফেলল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ঈশান বলল,
_”কি ব্যাপার একবার রিং বাজতেই ধরে ফেললে। ঘুমাওনি?
_”ঘুম আসছিল না।
_”কেন? আমাকে ইমপ্রেস করার প্ল্যান করছিলে বুঝি?
_”না স্যার! জ্বরটা হয়তো বাড়ছে।
_”জ্বর সেরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবো?
_”কিভাবে স্যার?
_” তোমার আজকের বাকি মুহূর্ত গুলো আমাকে দিয়ে দাও!

ঈশানের কথা শুনে অহনা দেয়ালে লটকে থাকা ঘড়ির দিকে তাকালো। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় সাড়ে বারোটা বাজতে শুরু করেছে।
_”স্যার এখন তো অনেক রাত।
_”সো হোয়াট?আমি গাড়ি নিয়ে তোমার বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করছি। এখন তুমি সিদ্ধান্ত নাও আজকের বাকি মুহূর্ত গুলো আমাকে দিবে নাকি না?
_”স্যার আমি উঠে দাঁড়াতেও পারছি না।
_”তাহলে তুমি আসবেনা?????

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।