দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১২

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১২

ঈশান কে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুনে রিজওয়ান বাইরে বেরিয়ে আসলো।
_”তোমরা কে কোথায় আছো? অহনা বলেছে ওকে ইচ্ছে মতো মারো। মারতে থাকো যতক্ষণ না ও মৃত্যুর চেহারা দেখে।

রিজওয়ানের আদেশ হওয়া মাত্রই সবাই ঈশানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর শুরু হয়ে গেল এলোপাতাড়ি আঘাত! মার খেতে খেতে এক পর্যায়ে ঈশানের দু ‘চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসলো। ঠিক সেই মুহুর্তে ঈশান বলে উঠলো,
_”অহনা তোমাকে আমি,,,,,,,

ঈশান আর কিছু বলতে পারলো না। জ্ঞান হারিয়ে মুখ থুবরে মাটিতে পড়ে গেল!
ঈশান কে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে রিজওয়ান সবাইকে হাতে ইশারা করে বলল।
_”থামো! ওকে আর মারার কোন প্রয়োজন নেই‌। কোন কিছু হয়ে গেলে আমরাই ফেঁসে যাবো।

রিজওয়ানের কথা শুনে সবাই এক সাইডে সরে দাঁড়ালো। মারের প্রচন্ডতায় ঈশানের কপালের ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়ায় সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু রিজওয়ান সেদিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে বাংলো থেকে একটা ইনজেকশন এনে ঈশানের শরীরে পুশ করে দিল।

রিজওয়ান কে ঈশানের শরীরে ইনজেকশন পুশ করতে দেখে একজন বডিগার্ড এগিয়ে আসলো,
_”স্যার এটা কি করলেন?
_”তুমি বুঝবে না।
_”কিন্তু স্যার এই ইনজেকশনের মাধ্যমে উনার যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে?
_”এটা কোন ক্ষতি হওয়ার ইনজেকশন নয়। যেকোনো মুহূর্তে ভাইয়ার জ্ঞান ফিরে আসতে পারে। তাই এই ইনজেকশনটা দিয়ে দিলাম।

বডিগার্ড আর কোন কথা না বলে আগের জায়গায় ফিরে গেল। সবাই ঈশান কে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিন্তু রিজওয়ান শুধু এদিক-ওদিক পায়চারি করতে লাগলো। হঠাৎ রিজওয়ান প্যান্টের পকেট থেকে ‌ফোন বের করে মীরাকে কল করলো।
_”হ্যালো মীরা!
মীরা ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
_”কি ব্যাপার রিজওয়ান! এত রাতে কেন কল করেছো?
_”তুমি এক্ষুনি তোমার গাড়ি নিয়ে আমার গ্রীনহাউজে চলে এসো!
_”হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি? জানো এখন কত রাত!
_”হ্যাঁ আমি জানি। কিন্তু যত রাতই হোক না কেন তুমি এক্ষুনি আসো!
_”কিন্তু কেন রিজওয়ান?
_”কারণ ভাইয়া আমার গ্রীন হাউজের সামনে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে।
_”কি? ঈশানের কি হয়েছে? তুমি কি করেছো ওর সাথে?
_”এসব কিছু জানতে হলে তোমাকে তো আসতে হবে। তাড়াতাড়ি চলে এসো!

এতোটুকু বলেই রিজওয়ান ফোন কেটে দিল। ঠিক আধাঘন্টা পরেই মীরা এসে উপস্থিত হল। ঈশান কে মাটিতে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে মীরা দৌড়ে এসে ঈশানের মাথাটা নিজের কোলের উপর রাখলো।
_”ঈশান কি হয়েছে তোমার? এভাবে রক্ত বেরোচ্ছে কেন কপাল থেকে? তোমার এই অবস্থা কে,,,,, এতোটুকু বলেই মীরা ধীরে ধীরে রিজওয়ানের দিকে তাকালো।

_”কি করেছ তুমি ঈশানের সাথে? বলো কি করেছো তুমি আমার ঈশানের সাথে?
_”শান্ত হও মীরা! ভাইয়ার সাথে আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। ভাইয়া আমাকে মারতে চেয়েছিল। তাই আমি ভাইয়াকে মার খাইয়েছি ।
_”কি? এতগুলো বডিগার্ড থাকতে ঈশান তোমাকে মারতে এসেছিল? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
_”না করতে চাইলে করোনা। তবে এদিকে এসো তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।

মীরা ঈশান কে নিচে শুইয়ে দিয়ে রিজওয়ানের এর কাছে গেল।
_”বলো কি বলবে?
_”শোনো মীরা! ভাইয়া কে তুমি তোমার হাউজে নিয়ে যাও।
_”কিন্তু ঈশান যদি জেগে যায়?
_”তুমি কি আমাকে এত কাঁচা ভাবো? আমি ভাইয়াকে ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি। তিন ঘণ্টা আগে তো ভাইয়ার ঘুম কিছুতেই ভাঙবে না। আর ঘুম ভাঙার পরেও ইনজেকশনের কারণে ঘুমের রেশ টা আরও আধা ঘন্টা শরীরে থেকে যাবে।
_”ওহ্ থ্যাংক গড! কিছু হলেও তাহলে তোমার বুদ্ধি আছে। যাইহোক আমি এখন আসি!

মীরা ফিরে আসতে নেয় কিন্তু রিজওয়ান মীরার হাত ধরে ফেলে।
_”কি হলো হাত ধরলে কেন?
_”নাইট ড্রেস টা তো চেঞ্জ করে আসতে পারতে নাকি? এতগুলো ছেলে তোমাকে দেখছে।
_”ঈশানের কিছু হয়ে যাচ্ছে আমার মাথা ঠিক থাকতে পারে? তাই যেভাবে পেরেছি সেভাবেই ছুটে এসেছি।
_”হুম ঠিক আছে। কি করতে হবে মনে আছে তো?
_”হ্যাঁ খুব ভালো করে মনে আছে!
_”শোনো যা করবে ঘুম থেকে জাগার পর আধা ঘন্টার ভিতরেই করবে। ওই সময় ভাইয়া একটা ঘোরের মধ্যে থাকবে।
_”আরে ডিয়ার তুমি এতো ভেবোনা! সে সবকিছু আমিই সামলে নেবো।

মীরা আর দেরি না করে ঈশানকে নিয়ে চলে গেলো। রিজওয়ানও বাংলোর ভেতরে চলে গেল। অহনা আর ঈশান দুজনেই একটা অজানা ঘোরের মধ্যে আলাদা করে রাত কাটালো।

সকালের আলো হালকা ফুটতেই অহনার ঘুম ভেঙে গেল। অহনা চোখ খুলে অপরিচিত জায়গা দেখে লাফ দিয়ে বসে পড়লো। এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে উঁকিঝুঁকি করতে করতে এক জায়গায় এসে অহনার চোখ আঁটকে গেলো। অহনার ঠিক ডান পাশে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে রিজওয়ান। অবশ্য রিজওয়ানের বুকের উপর একটা নিউজ পেপার রাখা আছে। যেটা বুকের উপর থেকে নিচে পরে যায় নি আবার এলোমেলোও হয়নি। সুতরাং একটা বিষয় স্পষ্ট রিজওয়ান একটু আগেও সজাগ ছিলো।

অহনা রিজওয়ান কে ডাকার জন্য বিছানা থেকে নামতে নিলো। ঠিক তখনই অহনা চমকে উঠলো সামনের দেয়ালে আঁটকে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখে। অহনার গায়ের রিজওয়ানের পোশাক। এটা দেখে অহনার পুরো মাথা গরম হয়ে গেল। অহনা দৌড়ে গিয়ে রিজওয়ানের কলার ধরে টেনে উঠালো।

রিজওয়ান ঘুমের ঘোরে ধীরে ধীরে অহনার দিকে তাকালো। কিন্তু কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অহনা রিজওয়ান কে একটা চড় মেরে বসলো।
_”কি করেছেন আপনি আমার সাথে? বলুন কি করেছেন?
_”মানে? এসব কি বলছো তুমি? আমি আবার তোমার সাথে কি করবো?
_”খবরদার! একদম নেকামি করবেন না। কি করেছেন এখন বুঝতেই পারছেন না?
_”না আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না।
_”আমার গায়ে আপনার পোশাক কি করে আসলো? আপনি আমার অজ্ঞানের সুযোগ নিলেন? ছি! আমি আপনাকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু আপনি তার এই প্রতিদান দিলেন?
_”অহনা শান্ত হও! তুমি যা ভাবছো সেরকম কিছুই না।
_”তাহলে কি রকম কি? বলুন পরিষ্কার করে!

রিজওয়ান অহনার কথার কোন উত্তর না দিয়ে জোরে আওয়াজ দিলো। সাথে সাথে ঘরে দুজন মেয়ে ঢুকলো।
_”এদের দেখেছো? তোমাকে আমি নই এরাই চেঞ্জ করিয়ে দিয়েছে।
যাও তোমরা এখন! রিজওয়ানের আদেশ হওয়া মাত্রই দুজনে চলে গেল। অহনা মাথা নিচু করে রাখলো!
অহনাকে লজ্জা পেতে দেখে রিজওয়ান বলল,
_”শোনো অহনা! কাউকে এতটা অবিশ্বাস করতে হয় না। তাছাড়াও আমি তোমার সাথে অবিশ্বাসের মতো কিছুই করিনি। যা করার সে তো তোমার হাজব্যান্ড করেছে।

এতো গভীর রাতে তোমাকে মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়ে মীরার সাথে গাড়িতে করে,,,, থাক আর বললাম না। বলতে গেলে নিজেরই লজ্জা লাগে!
_”এসব কি বলছেন আপনি? এত রাতে স্যার মীরা ম্যামের বাড়িতে কেন যাবেন?
_”সেটা তুমি তোমার স্যারকেই জিজ্ঞাসা করো!
_”ঠিক আছে !
আমি এখন বাড়ি যাবো। আমাকে বাড়িতে না পেয়ে সবাই চিন্তিত হয়ে যাবে।

এ কথা বলেই অহনা উঠে দাঁড়ালো ।কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিলো। যদিও তার আগেই রিজওয়ান অহনা কে ধরে ফেললো।
_”কি হলো অহনা? শরীর ঠিক আছে তো?
_”হ্যাঁ স্যার! মাথাটা একটু ঘুরছে এই আর কি।
_”মাথা ঘুরছে? দেখি কি হয়েছে।
রিজওয়ান অহনার কপালে হাত দিয়েই আঁতকে উঠলো!

_”একি অহনা! তোমার গাঁ তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! এই অবস্থায় তুমি একা একা কিভাবে বাড়ি যাবে? আমি না হয় তোমায় বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। অহনা রিজওয়ানের সাথে আর কোন কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।

অন্যদিকে ঘুমের ঘোর কাঁটার পর নিজেকে মীরার সাথে এভাবে বিছানায় জড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশানের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ঈশান এক ধাক্কায় মীরাকে সরিয়ে দিলো।
_”কি ব্যাপার আমি এখানে কেন? আর তুমি এভাবে?
মীরা ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
_”ঈশান কাল রাতে আমি গ্রীনহাউজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে জ্ঞান হারা অবস্থায় পেয়েছিলাম। তাই তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি।
_”বেশ! আমার শার্ট কোথায়? আর এটা খুলেছো কেন?
_” তুমি কালকে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছিলে। আর কাদামাটি তো তোমার গায়ে একেবারে লেপ্টে ছিল। তাই তোমার শার্ট টা আমি ধুয়ে দিয়েছিলাম।
_”এই শার্ট টা দেখে কেউ বলবে না এটা কোন ধোয়া শার্ট।
যাইহোক আমাকে এনেছো ভালো কথা। অনেক বড় দয়া করেছো তুমি ঈশান খান কে। কিন্তু আমার সাথে এভাবে এক ঘরে না থাকলেও পারতে।
_”আমি তোমার সাথে থাকতে চাই নি। তুমি আমাকে জোর করে রেখেছো।
_”হোয়াট? মাথা খারাপ তোমার? আমাকে তুমি অজ্ঞান অবস্থায় এনেছো। কারণ আমাকে এত মারা হয়েছিল যে,,,,, এতোটুকু বলতেই ঈশানের গতরাতে সমস্ত ঘটনা মনে পড়ে গেল। সেই সাথে মনে পড়ে গেল ঈশানকে মারার জন্য অহনার আদেশ।

_”আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে!
_”কিন্তু ঈশান তুমি,,,,,

ঈশান মীরার কোন কথা না শুনে দ্রুত বের হয়ে গেল। ঈশানের টার্গেট এই মুহূর্তে অহনার বাড়ি যাওয়া। যেহেতু মীরার বাড়ি গ্রীন হাউজ থেকে আগে ছিল তাই অহনার আগেই ঈশান পৌঁছে গেল।
ঈশান কে সকাল-সকাল বাড়িতে দেখে অহনার বাবা বেশ অবাক হল!

_”আরে বাবু!
_”বাবু নয় ঈশান খান! আমাকে ঈশান বলবে বাবু নয়।
_”হ্যাঁ ঠিক আছে ঈশান এত সকাল সকাল?আর তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?
_”সেসব কথা পরে হবে আগে তোমার মেয়েকে ডেকে দাও।

অহনার বাবা সোহানাকে ডাক দিল,
_”অহনাকে একটু ডেকে দে দেতো মা। সোহানা পুরো বাড়ি ঘুরে ফিরে এলো।
_”বাবা আপু তো কোথাও নেই।
_”নেই মানে? কোথায় যাবে অহনা?
অহনার বাবাকে এভাবে অবাক হতে দেখে ঈশান বলল,
_”তোমার মেয়ে কি রাত বিরাতে বাহিরে যায় নাকি?
_”এসব তুমি কি বলছো বাবা? অহনা বাইরে কেন যেতে যাবে?

অহনার বাবা আরো কিছু বলতে গেল কিন্তু তার আগেই লিভিংরুমে অহনা প্রবেশ করলো। অহনাকে বাহির থেকে ঢুকতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। তবে তার থেকেও বেশি অবাক হলো অহনা ঈশানকে লিভিং রুমে বসে থাকতে দেখে!
অহনাকে দেখে ঈশান দাঁড়িয়ে গেল।
অহনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঈশান একবার ভাল করে চোখ বুলালো। ঈশান কে এরকম অদ্ভুত ভাবে তাকাতে দেখে অহনা আমতা আমতা করে বলল,
_”স্যার আপনি?

_”কেন এত সকাল সকাল আমাকে আশা করোনি বুঝি?
_”না স্যার আমি,,
_”থাক অহনা! কিছু বলার কোন প্রয়োজন নেই। সবকিছু তো নিজ চোঁখেই দেখতে পাচ্ছি। তবে যাই বলো তোমাকে কিন্তু এই পোশাকে খুব ভালো লাগছে! তোমার পোশাকই বলে দিচ্ছে আমাকে মার খাইয়ে সারা রাত্রিবেলা তুমি কত আনন্দে মত্ত ছিলে!

ঈশানের কথা শুনে অহনা চমকে নিজের পোশাকের দিকে তাকালো! তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফেরার তাড়নায় রিজওয়ানের পোশাক চেঞ্জ করে নিজের পোশাক পরার কথা ভুলেই গেছিলো অহনা।
অহনা মাথা নিচু করে‌ ভীত গলায় বলল,
_”স্যার! আপনার কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।
_”শাট আপ! আমাকে ভুল সঠিক শেখাবে তুমি? অহনা আমি কোন বাচ্চা ছেলে নই যে, আমাকে তুমি যা বুঝাবে আমি তাই বুঝবো।
_”স্যার আপনার শার্টে,,,,
_”চুপ করো তুমি! আমি তোমার মুখ থেকে একটা কথাও শুনতে চাই না।

ঈশান অহনার থেকে মুখ ঘুরিয়ে অহনার বাবার দিকে তাকালো।
_”এখন কি বলবে তুমি? তোমার বোন ধুয়া তুলসী পাতা ছিল? নাকি তোমাদের পরিবারের মেয়েরাই এরকম?একজন ছেলের সাথে বিয়ে করবে আরেকজন ছেলের সাথে রাত কাটাবে।
_”বাবু তুমি এসব কি বলছো বাবা?
_”ডোন্ট কল মি বাবু? আমি ঈশান খান। মাথায় রেখো কথাটা!

ঈশান রাগে হন হন করে ঘর থেকে বের হয়ে মেডিকেলের দিকে পা বাড়ালো।
ঈশান মেডিকেলে ঢুকতেই সবাই ঈশান কে নিয়ে কানাঘুষা করতে শুরু করে দিলো। যদিও সবার এরকম কানাকানি করে হাসার কারণ ঈশান জানেনা। তবে ঈশানের যথেষ্ট অস্বস্তিও হচ্ছিলো!

অন্যদিকে ঈশান কে এভাবে কথা শুনিয়ে চলে যেতে দেখে অহনা কাঁদতে শুরু করে দিলো। অহনার বাবা এসে অহনার পাশে বসলো।
_”কি হয়েছে রে মা? সারারাত্রি তুই কোথায় ছিলি?
_”বাবা আমি এসব প্রশ্নের কোন উত্তর তোমাকে দিতে পারবো না। এসব প্রশ্নের উত্তর যে দেওয়া যায় না।
_”আমি তোর কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু পরিষ্কার করে বল মা!
_”বাবা মামনি তার এই ছেলের জন্য ১৫ বছর কেঁদে কেঁদে জীবন উজাড় করে দিলো? যে ছেলে কিনা তার মা সম্পর্কে একটাও ভালো কথা বলে না। আমার তো আজকে মামণির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে!

_”কষ্ট পেয়ে আর কি লাভ হবে? আমার বোনটার কপালে সুখ ছিল না! নাহলে পাঁচ বছরের ছেলেটা মায়ের কোল থেকে চলে যায়?
_”বাবা ঈশান স্যার যদি জানতেন মামনি জীবনভর স্যারের জন্য কত অপেক্ষা করেছেন। তাহলে হয়তো স্যারের এই রাগগুলো থাকতোই না।
_”থাকতো থাকতো। কারণ বাবুর মনটা আরিয়ান বিষিয়ে দিয়েছে। বাবু নিজের মায়ের ব্যাপারে খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই জানেনা। আর সেজন্য ও তোকেও খারাপ ভাবছে! যদিও আমি জানি না কাল সারারাত তুই কোথায় ছিলি।

অহনা বাবার সাথে আর কোন কথা না বাড়িয়ে লিভিং রুম ছেড়ে নিজের রুমে চলে আসলো। কিন্তু জ্বরের ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে অহনা স্বস্তিতে বসতেও পারল না।যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অহনা রিসিপশনে কল করে ছুটি চাইলো। কিন্তু ঈশান কোনোভাবেই অহনার ছুটি মঞ্জুর করল না। উল্টো রাসটিকেট করার ভয় দেখালো।

বাধ্য হয়ে জ্বর নিয়েই অহনা মেডিকেলে উপস্থিত হল। আর অন্যান্য দিনের মতো ফার্স্ট ফ্লোর থেকে নিয়ে টুয়েন্টি ফিফথ ফ্লোর পর্যন্ত পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়লো। ঈশানের এমন অমানবিক কাজ দেখে রিজওয়ান ঈশানের কেবিনে গেল,

_”ভাইয়া এটা কি হচ্ছে?
_”কি?
_”তুমি ওকে দিয়ে এভাবে কেন কাজ করাচ্ছো?
_”বাহ্! গতকাল রাতের পর থেকে তো দেখছি অহনার জন্য তোমার একটু বেশিই মায়া!
_”মায়া হওয়াটা তো খুব স্বাভাবিক ভাইয়া!
রিজওয়ান আরো কিছু বলতে গেল কিন্তু তার আগেই একজন নার্স দৌড়ে ভেতরে ঢুকলো।
_”স্যার অহনা মাথা ঘুরে সিঁড়িতে পড়ে গেছে।
_”হোয়াট? কিভাবে পড়ে গেল? তোমরা কোথায় ছিলে?
_”স্যার আমরা তো আমাদের কাজে ছিলাম। অহনা তো নিজের কাজ করছিল। ওকে কেয়ার করা তো আমাদের দায়িত্ব ছিল না। তাছাড়াও প্রচন্ড জ্বরে এরকম হয়েছে।
_”জ্বর?
_”জি স্যার! জ্বরের জন্য ও ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু আপনি তো ছুটি মঞ্জুর করেন নি।

ঈশান একবার রিজওয়ানের দিকে তাকালো। তারপর দ্রুত কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। থার্ড ফ্লোর এর সিঁড়িতে স্টুডেন্টেদের ভিড় হয়ে গেছে। সবাই অহনাকে ঘিরে রেখেছে। ঈশান সবাইকে সরিয়ে অহনার কাছে এগিয়ে আসলো। অহনার জ্ঞান যাচ্ছে যাচ্ছে অবস্থা! ঈশান দ্রুত অহনাকে কোলে তুলে নিলো।

_”তোমার এতো জ্বর আমাকে একবার পরিষ্কার করে বলতে তো পারতে!
অহনা কোন কথা না বলে নিজের একটা হাত ঈশানের গলার কাছে ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
_”স্যার লিপস্টিকের দাগ! এতটুকু বলেই অহনা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল!

ঈশান দ্রুত অহনাকে নিজের কেবিনে এনে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল। আর তারপর এদিক ওদিক জল খুঁজতে লাগলো। ঠিক তখনই ঈশানের চোখ পড়লো আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে। ঈশান ধীরে ধীরে আয়নার একেবারে কাছে এগিয়ে গেল।

নিজের গলা আর শার্টের ছোট ছোট অংশে লিপস্টিকের দাগ দেখে ঈশানের মীরার সাথে কাটানো রাতের কথা মনে পড়ে গেল। ঈশান কোনমতে গলা থেকে লিপস্টিকের দাগটা মুছে দৌড়ে অহনার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো।

_”অহনা! তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। আমি কারো সাথে কিছু করিনি। গতকাল রাতে যা কিছু হয়েছে সে সবকিছু তোমার জন্যই হয়েছে। তুমি যদি রিজওয়ানের কোলে করে ওর গাড়িতে না উঠতে, ওর বাংলোতে না যেতে, আমাকে মারতে না বলতে তাহলে আমার সাথে এসব কিছুই ঘটতো না।

বাট ট্রাস্ট মি! আমি মীরার সাথে কিছুই করিনি। হতে পারে আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি। কিন্তু আমি অতটাও খারাপ নই যে তোমাকে ছেড়ে অন্য কোন মেয়ের সাথে নোংরামি করবো!

_”তোমাকে যদি অহনা ভুল বুঝে তাতে প্রবলেম কি ভাইয়া?
রিজওয়ানের কথা শুনে ঈশান দাঁড়িয়ে গেল।
_”বলো প্রবলেম কি?
_”হ্যাঁ আমার প্রবলেম আছে। কারণ আমি অহনা,,,
_”অহনা?? কি ভাইয়া??
_”অহনার জীবনটা শেষ করে দিতে চাই! ওকে তিলেতিলে মারতে চাই!
_”মিথ্যে বলছো কেন ভাইয়া? তুমিতো অহনাকে ভালোবাসো তাই না? আর মীরার সাথে,,,!
_”শাট আপ! একদম খারাপ কথা বলবেনা!
না আমি অহনা কে ভালবাসি আর না মীরাকে ভালোবাসি।

ঈশান এতোটুকু বলার সময় অহনার জ্ঞান ফিরে আসলো। ফলে অহনা শুধুমাত্র ‘মীরাকে ভালোবাসি’ এতটুকুই শুনতে পেলো!

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।