দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১১

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১১

কন্ঠটা শুনেই অহনা চমকে উপরে তাকালো। একটু আগে যতটা না চমকে ছিল অহনা তার থেকেও দ্বিগুণ চমকে গেল যখন দেখল হেলমেট হাতে ঈশান দাঁড়িয়ে আছে।

অহনা তোতলাতে তোতলাতে কিছু একটা বলতে গেলো। কিন্তু তার আগেই ঈশান বলে উঠলো,
_”ভালো তুমি যাকেই বাসো না কেন মিস স্কলার্শিপ নাউ ইউ আর মাই লিগেল ওয়াইফ!

এতোটুকু বলেই ঈশান চোঁখে চশমা লাগিয়ে বের হয়ে গেল।আর অহনা ধপাস করে সোফায় বসে পরলো।
অহনার বুকের ভেতরটা ধুকধুক করছে! কিন্তু এটা কেন? ঈশানকে এত কাছে পেয়ে নাকি অন্য কোন কারণে!

ঈশান চলে যাওয়ার পর অহনার বাবা অহনার মুখোমুখি হয়ে বসলো। বাবাকে বসতে দেখে অহনা বড় করে তিনটা শ্বাস নিয়ে বলল,
_”বাবা তুমি তো আমাকে কখনোই বলোনি ঈশান স্যারই মেঘনা মামুনির ছেলে।
_”আমি কি জানতাম আমাদের সেই ছোট্ট বাবু এত বড় হয়ে গেছে? আর এখন সবাই তাকে বিশ্ব বিখ্যাত সাইকোলজিস্ট ঈশান খান নামেই চেনে।
_”সবকিছুই ঠিক আছে। কিন্তু স্যারের সাথে হঠাৎ কি মনে করে তুমি এমন হুটহাট করে আমার বিয়ে করিয়ে দিলে?
_”আমি নিজ ইচ্ছেতে তোর বিয়ে করিয়ে দিই নি। বাবু আমাকে ফোর্স করেছে। তোর জন্য বাবুর একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেজন্য নাকি আরিয়ান তোকে কলেজ থেকে রাসটিকেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু তাই না তোর নামে পুলিশের কাছে মামলা করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
_”হ্যাঁ কিন্তু আমি তো আমার একটা কিড,,,,,,,,?
_”কি হলো থামলি কেন?
_”না কিছুনা। তুমি বরং বলো এসব কিছুর সাথে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার কি সম্পর্ক ?
_”সম্পর্ক এটাই,বাবু আমাকে বলেছে আমি যদি তোকে ওর সাথে বিয়ে করিয়ে দেই তাহলে এসব কিছুই হবেনা।
_”এটা কেমন শর্ত বাবা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। স্যার আসলে চাচ্ছেন টা কি?
_”সেটা তো আমিও জানি না মা।
_”আচ্ছা বাবা স্যার আমাদের বাড়ি কিভাবে চিনলেন? স্যারের তো বাড়ি চেনার কথা নয়।

অহনা এই কথা বলতেই মিলি আওয়াজ দিয়ে উঠলো।
_”স্যার আমার সাথে এসেছেন?
_”তোর সাথে?
_”হ্যাঁ আমার সাথে। শুধু তাই নয় আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন স্যার।
_”হ্যাঁ সেটা আমি রিসিপশনেই শুনেছি। কিন্তু জোর করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেন সেটা ভাবতে পারিনি।
_”সেটা তো আমিও ভাবতে পারিনি অহনা।স্যার হঠাৎ করেই আমাকে ক্লাস রুম থেকে টানতে টানতে নিয়ে আসলেন। আর তারপর গাড়িতে উঠতে বললেন। গাড়িতে উঠে বললেন,
_”অহনার বাড়ির এড্রেসটা বলো।

আমিতো অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু স্যারের সাথে পাঙ্গা নেবে কে? তাই বাধ্য হয়ে আমি স্যারকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছি।কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি এত বড় কিছু হয়ে যাবে! আমার জন্য তোর আবারো ক্ষতি হয়ে গেল অহনা। তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস প্লিজ!

_”আরে থাম তুই! এখানে তোর তো কোন দোষ নেই। তোর জায়গায় আমি থাকলে আমিও স্যারকে বাড়িতেই নিয়ে আসতাম। কিন্তু আমি এসব কিছুর সাথে আমাকে বিয়ে করার কোন যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছিনা। কিংবা কোনো কারণ।

যাইহোক এখন সবাই যার যার রুমে গিয়ে বিশ্রাম করো। আমাকে একটু ভাবতে দাও প্লিজ! অহনার কথা শুনে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেল। আর অন্যদিকে অহনা হুটহাট বিয়ের কারণ খুঁজতে খুঁজতে ঈশান কে নিয়ে স্বপ্নের জগতে বিভোর হয়ে পড়ল! যতই হোক ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে বলে কথা!

এদিকে ঈশান বাড়ি ফিরতেই মিসেস আরিয়ান পথ রোধ করে দাঁড়াল,
_”কোথায় ছিলে এতক্ষন তুমি?
_”সেই কৈফিয়ৎ কি আমার আপনাকে দেওয়া লাগবে?
_”হ্যাঁ অবশ্যই দেওয়া লাগবে। কারণ তুমি আমার বাড়িতে থাকো।আর তুমি কোথায় যাচ্ছ বা না যাচ্ছ সে সবকিছু তো আমাকে জানানো উচিত তাইনা।
_”আপনি কি সেটাই মনে করেন?
_”অফকোর্স মনে করি।
_”কিন্তু আমি সেটা মনে করি না। এটা আমার বাবার বাড়ি। আর আমি এখানে যখন ইচ্ছে তখন আসতে পারি। আর এখান থেকে যখন ইচ্ছে তখন বের হতে পারি। সো প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!

ঈশান আর কোন কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেল।মিসেস আরিয়ানও মনে মনে ঈশান কে দু-তিনটা গালি দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
ঈশান ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে বসতেই রিজওয়ান ঈশানের রুমে ঢুকলো।
_”ভাইয়া তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল।
_”যা বলার বলতে পারো।
_”ভাইয়া সেদিনের জন্য সরি!
_”কোন দিন?
_”কোন দিন আবার? তুমি ভুলে গেলে?
_”তুমি তো প্রায় প্রতিদিনই অন্যায় করে থাকো। স্পেশাল ভাবে আবার কোন দিন টা মনে রাখব?
_”ভাইয়া তুমিও না! যাইহোক যতদিন যত ভুল করেছি সব ভুলের জন্য সরি!
_”শোনো রিজওয়ান! সব ভুলের কখনোই ক্ষমা হয় না। আর তুমি যেসব কীর্তিকলাপ করছো তার ক্ষমা তো মোটেও হয় না।
_”আমি সেরকম কিছুই করিনি। যার কোন ক্ষমাই হতে পারে না। যাইহোক ভাইয়া ছোট ভাই হিসাবে তোমাকে একটা এডভাইস দিতে চাই।
‘জীবনে যাই ডিসিশন নাও না কেন একটু ভেবেচিন্তে নিও। আর অন্যের জীবন নিয়ে কখনোই খেলা করো না। আসছি বেস্ট অফ লাক!

এতোটুকু বলেই রিজওয়ান ঈশানের ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ঈশান কিছুক্ষণ রিজওয়ানের কথাটা চিন্তা করলো। কিন্তু পরক্ষণেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিল।
সারা রাত্রি বেলা ঈশান আর অহনা দুজনের কেউই ঘুমাতে পারল না।
পরদিন সকাল আটটায় ঈশান মেডিকেলে পৌঁছে গেল। রিসিপশনে ঢোকামাত্রই ঈশানের চোখ পরলো বাঁ পাশে লাগিয়ে রাখা নতুন লিফলেটের দিকে। ঈশান এগিয়ে গিয়ে লিফটে টা পড়লো। ঈশান কে এভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখে নীলা এগিয়ে আসলো,
_”স্যার পড়া হয়ে গেছে?
_”হ্যাঁ।
_”এখন কি হবে স্যার?
_”সেটা সময় বলে দেবে।

ঈশান নীলার সাথে কোন কথা না বাড়িয়ে রিসিপশনে থাকা চেয়ারে বসে পড়ল। ঠিক এক ঘণ্টা পরেই এক এক করে মেডিকেল স্টুডেন্টরা ভিড় করতে লাগলো। কিন্তু কেউ ক্লাস রুমে না গিয়ে লিফলেট এর আশেপাশে হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকলো।

কিছুক্ষণ পরেই অহনা মেডিকেলে ঢুকলো। রিসিপশনে এত ভিড় দেখে অহনা অবাক হয়ে গেল!রিসিপশনের মাত্রাতিরিক্ত ভিড় দেখে অহনা যতটা না অবাক হয়েছে তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছে সবাইকে তার দিকে চেয়ে টিপ্পনি কেটে হাসতে দেখে।

অহনার কিছুটা অস্বস্তি ভরা চোখে মিলির দিকে তাকালো।
_”কি হয়েছে রে মিলি? সবাই আমাকে দেখে এমন হাসছে কেন?
_”সেটা তো আমিও জানি না।

গোলাবৃত্ত ভিড়ের মধ্যে কি আছে সেটা দেখার জন্য যখন অহনা আর মিলি দুজনে অগ্রসর হতে লাগল, ঠিক তখন আরিয়ান এসে দুজনের পথ রোধ করে দাঁড়ালো।
_”অহনা মেডিকেল এসেছো কেন তুমি?
_”স্যার আসবো না?
_”না। আসবে না।
_”কিন্তু কেন স্যার?
_”১’ঘাতকদের দ্বারা ঈশানের উপর আক্রমণ করা।
২’মার্কশিটে পাস নাম্বার উঠিয়ে দেওয়ার জন্য ঈশান কে নোংরা কাজের প্রস্তাব দেওয়া।
৩’রিজওয়ান কে নিজের প্ররোচনায় ফেলার চেষ্টা করা।
এই তিনটি কাজের দায়ে তোমাকে মেডিকেল থেকে রাসটিকেট করা হয়েছে।
নাউ গেট লস্ট।

আরিয়ানের কথা শুনে অহনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এক ইঞ্চি সামনের জিনিস গুলোও যেন অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না! চোখ দু’টো এত অন্ধকার হয়ে এসেছে!

অহনাকে ভাবে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিসেস আরিয়ান এগিয়ে আসলো।
_”কি ব্যাপার দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখনো বেরোচ্ছে না যে?
_”ম্যাম,,,
_”চুপ করো! তোমার মুখ থেকে এই ডাকটাও আমি শুনতে চাই না। কি মেয়েরে বাবা তুমি একসাথে দুটো ছেলের মাথা চিবানোর চিন্তা করছিলে! তুমি এক্ষুনি এখান থেকে বের হয়ে যাও! না হলে আমরা তোমার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে মামলা করবো।

মিসেস আরিয়ান এর কথা শুনে অহনা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। এতটা অপমান অহনা জীবনে আর কখনোই হয়নি। সেদিনও নয় যেদিন ঈশান সর্বপ্রথম এই অপবাদ টা দিয়েছিল!

অহনা কে আগের মতোই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিসেস আরিয়ান দুজন স্টাফকে বলল,
_”ওকে টেনে হেঁচড়ে এই মুহূর্তে মেডিকেল থেকে বার করে দাও।
মিসেস আরিয়ান এর কথা শুনে ঈশান রিসেপশন থেকে বের হতে হতে বলল,
_”স্টপ ইট! ডোন্ট টাচ অহনা!
ঈশান কে এরকম অদ্ভুত কথা বলতে দেখে মিসেস আরিয়ান বলল,
_”কিন্তু ঈশান,,,,,,,
_”আমি দেখছি ব্যাপার টা। আপনি এখান থেকে সরে যান! ঈশান এগিয়ে এসে অহনার সামনে দাঁড়ালো। ঈশান কে দেখে কেমন যেন অহনার সাহস একটু বেড়ে গেল। কিন্তু ঈশানের কথা শুনে পরক্ষনেই সমস্ত আশার আলো ধুপ করে নিভে গেলো।

_”অহনা তুমি কি চাও তোমার রাসটিকেট টা আটকে যাক?
ঈশানের প্রশ্নে অহনা কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তবুও আমতা আমতা করে বলল,
_”স্যার এটা তো যে কেউই চাইবে।
_”আমি যে কারো কথা বলিনি। তোমাকে প্রশ্ন করেছি। তাই সোজাসাপ্টা উত্তর দাও।
_”জি স্যার। আমি চাই আপনারা আমাকে ক্ষমা করে আমার রাসটিকেট টি বাতিল করে দিন।
_”হ্যাঁ ক্ষমা তো তোমাকে করবোই। তবে একটা শর্তে। একটা শর্তেই তোমার রাসটিকেট টি বাতিল হয়ে যাবে। এবার বলো তুমি কি রাজি?
_”স্যার রাসটিকেট আটকাতে আমি যেকোনো ধরনের শর্তে রাজি।
_”ভেবে বলছো?
_”জি স্যার।

ঈশান দুজন সুইপার আর দুজন আয়াকে ডেকে আনলো।
_”আজকের পর থেকে তোমরা আর এই মেডিকেল কাজ করবে না।
_”কিন্তু সাহেব,,,,
_”এখন যাও পরে দেখছি!

ঈশানের এরকম অদ্ভুত কান্ড কারখানা দেখে আরিয়ান বলল,
_”ঈশান তুমি কি করতে চাইছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা।
_”ওয়েট করো! একটু পরেই সব বুঝতে পারবে।

ঈশান অহনাকে নিজের কাছে ডাকলো।
_”আজকের পর থেকে এই চারজনের যা যা কাজ ছিল সবকিছু তুমি করবে। জানো তো ওই চারজন কি কি কাজ করতো?

অহনা হাঁ করে ঈশানের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,
_”স্যার আমি ভাবতে পারছি না। আপনি নিজের স্ত্রীকে এতোটাও লাঞ্চিত করতে পারেন!
_”আস্তে কথা বলো! এ বিষয়টা যেন এখানে কোনভাবেই জানাজানি না হয়। না হলে তোমার সাথে যা হবে তা স্বপ্নেও তুমি ভাবতে পারবে না।
যাইহোক আপনারা এখন যার যার কাজে চলে যান। আজকে থেকে অহনাই ওই চারজনের কাজ করবে। আসি মিস স্কলার্শিপ!

ঈশান নিজের কেবিনে চলে গেল।সেই সাথে প্রত্যেকেই যে যে যার যার কাজে চলে গেল। শুধুমাত্র দাঁড়িয়ে রইল অহনা।

সবাই চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রিজওয়ান আসলো।
_”আমি জানি অহনা তোমার সাথে অনেক খারাপ,,,,
_”চলে যান আপনি এখান থেকে প্লিজ! আমি আপনার সাথে কোন কথাই বলতে চাই না।
রিজওয়ান আর কোন কিছু না বলে চলে গেল।

রিজওয়ান চলে যাওয়ার পর অহনা নিজের কাজে লেগে পড়লো। ফার্স্ট ফ্লোর থেকে নিয়ে টুয়েন্টি ফিফথ ফ্লোর পর্যন্ত ঝাড়ু দিয়ে মুছতে মুছতে অহনার প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল।

দুই ঘন্টা পরে অহনা ক্লাসে উপস্থিত হল। অহনাকে দেখে সহপাঠীদের খুব মন খারাপ হয়ে গেল। যে যত যাই বলুক না কেন সহপাঠীরা তো অহনাকে ভীষণ ভালোবাসে!

অহনা ক্লাসে বসতে না বসতেই ঈশানের ক্লাস শুরু হয়ে গেল। ঈশান ক্লাস রুমে ঢুকে ভালো করে একবার ক্লাস রুমটা দেখলো। তারপর অহনার কাছে এগিয়ে আসলো।
_”আজকে তো দেখছি ক্লাস রুম গুলো ক্লিন করা হয়নি। তবে কাল থেকে যেন অবশ্যই ক্লাস রুম গুলো ক্লিন থাকে!
অহনা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

ক্লাস শেষ করে অহনা কোন মত বাড়ি ফিরে আসলো। যদিও পথিমধ্যে মিলিকে অহনা অনুরোধ করে রেখেছে এসব কথা যেন কোনোভাবেই অহনার বাড়িতে জানাজানি না হয়। অগত্যা কোন উপায় না দেখে মিলিও অহনার আবদার মেনে নিল!

এভাবে প্রায় ৪/৫ দিন কেটে গেল।

মেডিকেলে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনাগুলো নিয়ে অহনা খুব চিন্তায় ছিল। কোন ভাবেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। ঈশানের এরকম ব্যবহারের কোনো কারণই ছিলো না অহনার কাছে।

*রাত প্রায় একটা বাজতে শুরু করেছে। কিন্তু অহনা দু’চোখের পাতা এক করতে পারছে না। হঠাৎ অহনার ফোনে রিং বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে অহনা চমকে উঠল !ঈশান কল করেছে। অহনা কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ঈশান বলল,
_”আমার সাথে দেখা করো!
_”স্যার আপনি কোথায়?
_”যেখানেই থাকি আসো!
_”স্যার এখন তো অনেক রাত।
_”সো হোয়াট? রাত বলে কি তুমি আমার কাছে আসতে পারো না? নাকি তোমার কাছে আমাকে অতটাই ক্যারেক্টার লেস মনে হয় যে তোমার সাথে অন্য কিছু করবো।
_”না স্যার। আপনি যেটা বলছেন আমি এরকম কিছু বোঝাচ্ছি না। আমি বলছি স্যার বাহিরে অনেক বৃষ্টি। আর খুব বজ্রপাতও হচ্ছে।
_”তো ?বজ্রপাত খেয়ে ফেলবে তোমাকে?
_”না। ঠিক আছে স্যার কোথায় আসতে হবে?
_”আমাদের মেডিকেলের ডান দিক দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে। আমি ওই রোডের শেষ মাথায় আছি।
_”কিন্তু স্যার ওই রাস্তাটা তো খুবই নির্জন! আমি একা একা,,,,,
_”তুমি আসবে?
_”জি স্যার আসছি!
_”আর হ্যাঁ সাথে অবশ্যই রেজিস্ট্রি পেপারটা নিয়ে আসবে।
এতটুকু বলেই ঈশান ফোন কেটে দিল।

অহনা ভালো করে আশেপাশে দেখে খুব সাবধানতা অবলম্বন করে বৃষ্টির মধ্যে বের হয়ে গেল। রাস্তা এতটাই শুনশান যে, ভয়ে অহনার বুক কেঁপে উঠলো!
হাঁটতে হাঁটতে যখন অহনা মেডিকেলের কাছে পৌঁছে গেল ঠিক তখন অহনা লক্ষ্য করলো কয়েকজন ছেলে অহনার দিকে ইশারা করে কিছু একটা বলছে।

এই দৃশ্য দেখে অহনা চিৎকার করতে করতে প্রাণপণে দৌঁড়াতে থাকে। আশেপাশে কোন দিকে লক্ষ্য না করে দৌড়ানোর কারণে ডান দিকের রাস্তার শেষ মাথায় এসে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে অহনা নিচে পড়ে গেল।

উপরে তাকাতেই অহনা ভয় পেয়ে গেল। রেইনকোট পড়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। অহনা কোনো কিছু না ভেবেই আকুতি মিনতি করে বলে উঠলো,
_”ভাই আমাকে বাঁচান! কয়েকজন ছেলে আমার পিছু নিয়েছে। আমি আপনার ছোট বোনের মত। প্লিজ আমাকে বাঁচান!
অহনার কথা শুনে ঈশান রেইনকোটের হুডি টা সরিয়ে দিলো। জলজ্যান্ত ঈশান কে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অহনা দৌড়ে গিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।কিন্তু ঈশান নিজের দুই হাত দিয়ে অহনাকে আবদ্ধ করা তো দূরে থাক স্পর্শ করেও দেখল না।
অহনা ঈশান কে আরো বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
_”স্যার আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম!
_”এখন তো ভয় শেষ হয়েছে? ছাড়ো! আর হ্যাঁ রেজিস্ট্রি পেপারটা দাও।
অহনা রেজিস্ট্রি পেপারটা ঈশানের হাতে তুলে দিল ।
_”বাহ্! এটা তো একেবারে ভিজেই গেছে।
_”স্যার প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে দেখতেই তো পাচ্ছেন। তারমধ্যে আমি ছাতাটা আনতে পারিনি। তাই ভিজে গেছে। সরি স্যার!
_”না সরি বলতে হবে না। আমার জন্য তো ভালোই হয়েছে।

এতটুকু বলেই ঈশান রেজিস্ট্রি পেপারটা ছিড়ে কুটিকুটি করে বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিল।
_”স্যার আপনি এটা কি করলেন?
_”নিজেকে যে আমার স্ত্রী দাবি করো। সেটার প্রমান কাউকে দেখাতে পারবে?

_”স্যার আপনি কেন এমন করছেন? দেখবেন একদিন এই ভুল গুলোর জন্য আপনাকে খুব পস্তাতে হবে!
অহনা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়লো।
_”আমার কাজ শেষ। তুমি বাড়ি চলে যেও। আমি এখন আসছি! আর হ্যাঁ গুড নাইট!
_”স্যার প্রমান না থাকলেও আমি আপনার স্ত্রী! আমাকে আপনার অন্তত বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসা উচিত। আর আপনি মাঝরাস্তায় আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছেন?
ঈশান একবার পিছে তাকালো। তারপর রেইনকোটের হুডি টা মাথার উপর ফেলে দিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।

এদিকে বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাওয়ার কারণে অহনার অবস্থা ছিল শোচনীয়! ঠান্ডায় অহনার পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করলো। হঠাৎ কারো একজনের কোমল স্পর্শে অহনার সমস্ত দেহের স্পন্দন থেমে গেল। অহনাকে অবাক করে দিয়েই সেই কেউ একজন টা নিজের শার্ট টা খুলে অহনার গায়ে জড়িয়ে দিল।

অহনা মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে গেল!
_”ঈশান স্যার যে রকমই হোক না কেন।নিজের স্ত্রী কিংবা একটা মেয়েকে মাঝ রাস্তায় ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে এত কঠোর কখনোই হতে পারেনা! এটা আমার মন ঠিকই বলেছিল।
অহনা খুশিতে উত্তেজিত হয়ে পিছনে ফিরতে ফিরতে বললো,
_”আমি জানতাম স্যার আপনি কখনোই,,,,, এতোটুকু বলেই অহনা চুপ হয়ে গেল। রেড কালার গেঞ্জি পড়ে মাথা নিচু করে রিজওয়ান কে বসে থাকতে দেখে অহনার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। অহনা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

_”স্যার!
_”স্যার নয় ভাইয়া!
_”ঈশান স্যার আমাকে,,,,,
_”আমি সব জানি অহনা। ভাইয়াকে ফলো করতে করতেই আমি এদিকে এসেছি। তোমার সাথে ভাইয়া আজও খারাপ কাজ করে গেল। কিন্তু কেন? ভাইয়া তো তোমাকে বিয়ে করেছে।

অহনা কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে রিজওয়ানের বুকের উপর পড়ে গেল। রিজওয়ান অহনাকে কোলে তুলে গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতে থাকে।
আর অন্যদিকে ঈশান অহনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য মেডিকেল থেকে বাইক বের করে ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে থমকে গেল!

ঈশান পেছন থেকে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। কিন্তু রিজওয়ান সেদিকে কোনো তোয়াক্কা না করে অহনাকে গাড়িতে তুলে নেয়। ঈশান বাইক নিয়ে রিজওয়ান কে অনুসরণ করতে থাকে। ঠিক আধা ঘন্টা পরে রিজওয়ান গাড়ি নিয়ে একটা বাংলোতে ঢুকে। ঈশানও বাইক নিয়ে বাংলাতে ঢুকতে নেয়। কিন্তু ১০_১৫ জন বডিগার্ড ঈশান কে আটকে দেয়।
ঈশান চিৎকার করে ওঠে,
_”আমার পথ আটকাচ্ছে? জানো আমি কে? আমি হলাম ডক্টর ঈশান খান।
_”সরি স্যার! আপনি যেই হোন না কেন।আমরা স্যারের অনুমতি ছাড়া আপনাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে পারবো না।
ঈশান বডিগার্ড এর সাথে অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি করল কিন্তু কোন লাভ হল না। ঈশানের চোখের সামনে দিয়েই রিজওয়ান অহনাকে কোলে নিয়ে বাংলোর একটা ঘরের ভেতরে চলে গেল। কিন্তু ঈশান কিছুই করতে পারল না। শুধু চিৎকার করতে লাগলো,

_”রিজওয়ান তুমি অহনাকে ছেড়ে দাও! ওর সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক আমি মানি না। বিকজ অহনা ইজ মাই ওয়াইফ! ডোন্ট টাচ অহনা!
ঈশান কে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুনে রিজওয়ান বাইরে বেরিয়ে আসলো।
_”তোমরা কে কোথায় আছো? অহনা বলেছে ওকে ইচ্ছামতো মারো। মারতে থাকো যতক্ষণ না ও মৃত্যুর চেহারা দেখে।

রিজওয়ানের আদেশ হওয়া মাত্রই সবাই ঈশানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর শুরু হয়ে যায় এলোপাতাড়ি আঘাত! মার খেতে খেতে এক পর্যায়ে ঈশানের দু ‘চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসলো। ঠিক সেই মুহুর্তে ঈশান বলে উঠলো,
_”অহনা তোমাকে আমি,,,,,,,

ঈশান আর কিছু বলতে পারলো না। জ্ঞান হারিয়ে মুখ থুবরে মাটিতে পড়ে গেল!

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।