দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১০

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-১০

অহনা কাঁদতে কাঁদতে রিজওয়ান কে শরীরের সব শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঈশান ছাদে এসে উপস্থিত হলো। অহনা আর রিজওয়ান কে এভাবে দেখে ঈশান ছাদের এক কোনে সরে দাঁড়ালো।
রিজওয়ান ধীরে ধীরে অহনাকে নিজের বাহুতে আবদ্ধ করল।
_”আমি জানতাম অহনা তুমি ঠিক বুঝতে পারবে।
_”স্যার আমি সবকিছু বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমার খুব দেরি হয়ে গেল। স্যার ট্রাস্ট মি আই লাভ,,,,,,

অহনা কথা শেষ করার আগেই ঈশান দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে ছাদ থেকে বেরিয়ে চলে আসলো। ঈশান কিছু সময় দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। বুকের মধ্যে বড্ডো চাপ !
কিন্তু কেন?ঈশান নিজেও জানেনা ঈশানের এত কষ্ট কেন হচ্ছে!

ঈশান ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে নেমে নিচে চলে গেল। আজ আর ঈশানের লিফটে উঠতে ইচ্ছে করছে না। ঈশান চলে যাওয়ার পর রিজওয়ান অহনাকে বললো,
_”অহনা আমি জানি তুমি আমাকে খুব ভালবাসো!হয়তো তোমার বিষয়টা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু তাতে কি? এখন তো বুঝতে পেরেছ।
অহনা আরো বেশি কাঁদতে শুরু করলো। সেই সাথে জড়িয়ে ধরার বাঁধনটা যেন ক্রমেই শক্ত হতে লাগল।

_”না স্যার আপনি ভুল বুঝছেন। আপনাকে কিভাবে
বলবো আমি নিজেও জানিনা। স্যার আমি আপনাকে নয় ।ঈশান স্যার কে ভালবাসি! খুব বেশি ভালোবাসি!
ঈশান স্যারকে ছাড়া আমি কিছুতেই থাকতে পারবো না।
_”কি?
রিজওয়ান অহনাকে সাথে সাথে ছেড়ে দিল।
_”এসব তুমি কি বলছো অহনা? তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
_”না স্যার। আমি তো ঈশান স্যারকে সেই রাতেই ভালোবেসে ফেলছি ,যে রাতে আমি হাজার অপমান করা সত্ত্বেও ঈশান স্যার বারবার শুধু আমার সেফটির জন্য আমার কাছেই এগিয়ে আসছিলেন।

অহনার কথা শুনে রিজওয়ান এক’পা দু’পা করে পিছনে সরতে থাকে। রিজওয়ান কে এভাবে দূরে চলে যেতে দেখে অহনা দৌড়ে গিয়ে রিজওয়ানের দু’পা জড়িয়ে ধরে।
_”স্যার আপনি এভাবে আমার থেকে দূরে সরে যেতে পারেন না! আমি জানি স্যার আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু বিশ্বাস করুন স্যার !
আমি আপনাকে নিজের ভাইয়ের থেকে বেশি কিছু কখনোই ভাবিনি’। আমার কোন ভাই নেই।যখন থেকে আপনাকে আমার জন্যে এত উতলা হতে দেখেছি, ঠিক তখন থেকেই আমি ভেবে নিয়েছি আপনিই আমার ভাই। আপনার মুখ চেয়ে আমি আমার ভাইয়ের শোক কাটিয়ে উঠেছি।

অহনার কথা শুনে রিজওয়ান কান্না করে দেয়। কোন কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায়না। তবে রিজওয়ানের ভিতরে কতটা কষ্ট হচ্ছে সেটা রিজওয়ান একাই জানে!
নিজেকে বহুকষ্টে সামলে রেখে রিজওয়ান বলল,
_”ঠিক আছে। জোর করে তো আর তোমার থেকে ভালোবাসা পাবো না। কারণ তোমার ভালোবাসা তো ভাইয়ার জন্য হয়ে গেছে! বলো কি করবো তোমার জন্য?

_”বেশি কিছু নয়। শুধুমাত্র ঈশান স্যারকে বুঝিয়ে দিন আমি স্যারকে ভালোবাসি!
_”তুমিতো জানো ভাইয়া মেয়েদেরকে অপছন্দ করে। তাহলে এসব কিভাবে সম্ভব হবে?
_”যদি সম্ভব না হয় তাহলে আমি কিভাবে থাকবো? স্যারের জন্য আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আমি কিভাবে বুঝাবো আমি স্যারকে কতটা ভালোবাসি?
_”সেটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে। ভাইয়ের বিষাক্ত মনোভাব দূর করার পদ্ধতি তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। জেতাতে চেষ্টা করো নিজের ভালোবাসাকে।
সে পর্যন্ত অল দ্যা বেস্ট!

এতোটুকু বলে রিজওয়ান চোঁখের পানি মুছতে মুছতে ছাদ থেকে বেরিয়ে আসলো। অহনা দৌড়ে এসে রিজওয়ানের কাঁধে হাত রাখলো,
_”স্যার আপনি খুশি তো?
রিজওয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়লো।
অন্যদিকে ঈশান কেবিনে পৌঁছামাত্রই মীরার মুখোমুখি হলো।

_”ঈশান তুমি আমার বাবা-মাকে কালকে রিজেক্ট কেন করলে?
_”আমার মনে চেয়েছিল তাই।
_”ঈশান সবকিছু কি তোমার মন মত হবে? আমাদের কি কোন মন নেই? কোন ফিলিংস নেই?
_”মন? ফিলিংস? এগুলো মেয়েদের আছে? মেয়েরা তো শুধু ছেলেদের কে ঠকায়!
_”ঈশান তুমি এসব কি বলছো? আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি!
_”ভালোবাসা ,ভালোবাসা, ভালোবাসা? এসব ছাড়া কি আর কিছু বোঝো না তোমরা? চলে যাও এখান থেকে! আর কখনো আমার সামনে আসবে না।
_”ঈশান তুমি এরকম ওভার,,,
_”গেট লস্ট!

ঈশান কে এভাবে উত্তেজিত হতে দেখে মীরা কেবিন থেকে বেরিয়ে চলে গেল। মীরা চলে যাওয়ার পর ঈশান দ্রুত ক্লাস রুমে গেল। ঠিক সেইসময়ে ক্লাসরুমে ছিল রিজওয়ান।রিজওয়ান কে দেখে ঈশানের মাথা প্রচুর গরম হয়ে গেল।
_”আরে ভাইয়া! তুমি এখানে কি করছ? এটা তো তোমার ক্লাস টাইম নয়।
_”সো হোয়াট? আসতে পারি না আমি?
এতোটুকু বলেই ঈশান মিলির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
_”চলো আমার সাথে তুমি!
_”হ্যাঁ স্যার কিন্তু এটা তো আমার ক্লাস টাইম।
_”আমি বললাম না আমার সাথে চলো।
ঈশান কে এভাবে মিলির সাথে জোরজবস্তি করতে দেখে রিজওয়ান এগিয়ে আসলো।
_”ভাইয়া এসব কি করছো তুমি? একজন স্টুডেন্টের সাথে তুমি জোর জবস্তি করছো? এ কাজটা কিন্তু সত্যিই খুব খারাপ!
_”শাট আপ!স্টুডেন্টের সাথে কোনটা খারাপ কাজ আর কোনটা ভাল কাজ সেটা আমাকে তুমি শেখাবে?
স্টুপিড!

ঈশান মিলির হাত ধরে টানতে টানতে ক্লাস রুম থেকে বের করে নিয়ে আসলো।
_”স্যার আপনি আমার সাথে কেন এরকম করছেন? আমিতো আপনার কোন ক্ষতি করিনি।
_”আমি বলেছি তুমি আমার কোন ক্ষতি করেছো? আর আমার সাথে কোথাও যেতে তোমার প্রবলেমটা কি?
_”স্যার এটা প্রবলেমের কথা নয়।
_”জানি কিসের কথা। আমার ক্যারেক্টার এতটাও খারাপ নয় যে, তুমি আমার সাথে কোথাও গেলে সেফ থাকবে না।

ঈশানের কথা শুনে মিলি আর কোন কথা বাড়ালো না। ঈশানের সাথে গাড়িতে উঠে বসলো।
অন্যদিকে অহনা খুশিতে দৌড়ে ঈশানের কেবিনে আসলো। কেবিনে আসামাত্রই বডিগার্ডেরা অহনাকে আটকে দিল।
_”প্লিজ আমাকে একটু স্যারের কাছে যেতে দিন! স্যারের সাথে আমার অনেক কথা আছে।
_”কিন্তু স্যার তো এই মুহূর্তে কেবিনে নেই।
_”নেই মানে? কোথায় গেছেন স্যার?
_”সেটা তো বলতে পারবো না। হয়তো রিসিপশনে থাকতে পারেন।
অহনা দৌড়ে রিসিপশন গেল।কিন্তু রিসিপশনের কোথাও নীলাকে না দেখে অহনা মাহিয়ার কাছে গেল।
_”ঈশান স্যার কে দেখেছেন?
_”হ্যাঁ স্যারকে তো দেখেছি। একটু আগেই দেখলাম মিলিকে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে কোথাও একটা গেলেন।
_”মিলিকে?
_”হ্যাঁ অফকোর্স!
_”আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?
_”না ভুল হবে কেন? আমি স্পষ্ট দেখেছি।
_”ঠিক আছে। আপনি বলতে পারবেন ঠিক কোথায় গিয়েছেন উনি?
_”না। এটা বলাতো সম্ভব নয়। তবে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন।
_”কোনভাবে স্যার নিজের বাড়ি যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?
_”সেটা বলতে পারবোনা অহনা। সরি! তবে তোমাকে কিন্তু খুব এক্সাইটেড দেখা যাচ্ছে। কোন স্পেশাল কিছু আছে নাকি?
_”না সেরকম কিছু না। আমি এখন আসছি!

অহনা দৌড়ে মেডিকেল থেকে বের হয়ে গেল। কোন কিছু না ভেবেই ঈশানের বাড়ি পৌঁছে গেল। বাড়িতে ঢুকতেই মিসেস আরিয়ানের মুখোমুখি হলো অহনা।
_”কি ব্যাপার এখানে তুমি? কোন প্রবলেম হয়েছে নাকি?
_”না ম্যাম! সেরকম বিশেষ কোনো কিছু নয়। আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন ঈশান স্যার এখানে এসেছেন কি না?
_”না। ঈশান তো এখানে আসেনি।
_”স্যার এখানে আসেননি?
_”আরে না। এখানে আসলে তোমার কাছে হাইড করার কি প্রয়োজন আমার?
_”না ম্যাম! আমি সেরকম কিছু বোঝাচ্ছি না। আমি এখন আসি তাহলে?
_”শোনো অহনা! একটা কথা বলি তোমাকে। ঈশানের সাথে চান্স নেওয়ার চেষ্টা করোনা। কারণ ঈশান মুখে যাই বলুক না কেন। ঈশান কিন্তু মীরা কেই ভালোবাসে! বিদেশে দুজন মিলে একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছে। বুঝতেই পারছো সেখান থেকেই ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।
_”কিন্তু ম্যাম আপনি এসব কথা আমাকে কেন বলছেন?
_”বলছি তার কারণ আছে। তুমি থার্ড পারসন হয়ে ঈশান আর মীরার মাঝে ঢুকার চেষ্টা করছো। সেটা আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি।
_”সরি ম্যাম! এটা আপনার ভুল ধারণা। আমি কখনোই কারো মাঝে ঢুকছি না। আসলে আমি জানতাম না ঈশান স্যার মীরা ম্যাম কে ভালোবাসেন!
এতটুকু বলেই অহনা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে লিভিং রুম থেকে বের হয়ে গেল। যদিও মাঝপথে অহনা রিজওয়ানের মুখোমুখি হয়েছিল। অহনা চলে যাওয়ার পর রিজওয়ান এগিয়ে আসলো তার মায়ের কাছে,

_”মা এই মিথ্যাগুলো বলার কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল?
_”কেন প্রয়োজন নেই রিজওয়ান?
_”নেই তার কারণ ও কাঁদছে। আর ও কাঁদলে আমার কষ্ট হয়।
_”আর আমার ছেলেকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার কষ্ট হয়।
_”কিন্তু মা,,,
_”আর কোন কিন্তু নয়।

রিজওয়ান মায়ের সাথে আর কোন কথা বাড়ালো না। অন্যদিকে অহনা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি পৌঁছে গেল। বাড়িতে ঢুকতেই অহনা চমকে উঠলো!
লিভিং রুমে নীল শার্ট পরে একটা লোক বসে আছে। যদিও লোকটার মুখ ঠিক পরিস্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ মাথায় হেলমেট পড়ে আছে।

অহনা সেদিকে কোনো তোয়াক্কা না করে বেডরুমে চলে গেল। অহনা বেডরুমে যাওয়ার পর অহনার বাবা এগিয়ে এসে অহনার হাতে একটা পেপার তুলে দিল।
_”অহনা মা তুই আমাকে মাফ করে দিস!
_”কেন বাবা কি হয়েছে?
_”তোর জীবনের সবথেকে বড় সিদ্ধান্তটা আমি তোর সাথে পরামর্শ না করেই নিয়ে নিলাম।
_”কি সিদ্ধান্ত নিয়েছো তুমি বাবা?
_”অহনা তুই একদিন বলেছিলি আমি যার সাথেই তোর বিয়ে দেব তোর তাতে কোনো আপত্তি নেই। তাই তোর ফুপাতো ভাই বাবুর সাথে আমি তোর পক্ষ থেকে উকিল হয়ে তোর বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে দিয়েছি। আমি তোর অজ্ঞাতনামা একজনের সাথে তোর বিয়ে দিয়ে ফেলেছি।

এতটুকু বলেই অহনার বাবা মাথা নিচু করে ফেলল। বাবার কথা শুনে অহনার ঈশানের কথা মনে পড়ে গেল! অহনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল।
_”বাবা যার সাথে ইচ্ছে আমার বিয়ে করিয়ে দাও। আমার আর কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি করার সব ইচ্ছে মরে গেছে। বাবা আমি একজনকে ভালবাসতে শুরু করেছিলাম! কিন্তু সে আমায় নয় অন্য কাউকে ভালোবাসে।
_”অহনা মা তুই আমাকে মাফ করে দিস! আমি যা করেছি তোকে বাঁচানোর জন্যই করেছি। তুই একবার লিভিং রুমে আয় মা!

অহনা আর কোন আপত্তি না করে বাবার সাথে লিভিং রুমে গেল। লিভিং রুমে পৌঁছাতেই অহনার ফুফাতো ভাই বাবু এগিয়ে আসলো।অহনা কোন কিছু ভেবে ওঠার আগেই নিজের পকেট থেকে বের করে একটা রিং অহনার হাতে পরিয়ে দিল বাবু।
অহনা কিছু সময় মাথা নিচু করে থাকলো। তারপর মুখ উপরে না তুলেই বললো,

_”না জীবনে আপনাকে কখনো আমি দেখেছি। আর না জীবনে আপনি কখনো আমাকে দেখেছেন। তবুও আপনাকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। হয়তো আপনি আমার ফুফাতো ভাই শুধু তাই। কিন্তু আমি আপনাকে কখনোই আমার জীবনে মেনে নিতে পারব না। কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি!

অহনা এতোটুকু বলতেই বাবু নিজের মুখের হেলমেটটা তুলে নিল। আর তারপর বিয়ের বেনারসি টা অহনার হাতে তুলে দিয়ে বলল,
_”সেটা আমি খুব ভাল করেই জানি। তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো!
কন্ঠটা শুনেই অহনা চমকে উপরে তাকালো। একটু আগে যতটা না চমকে ছিল অহনা তার থেকেও দ্বিগুণ চমকে গেল যখন দেখল হেলমেট হাতে ঈশান দাঁড়িয়ে আছে।

অহনা তোতলাতে তোতলাতে কিছু একটা বলতে গেলো। কিন্তু তার আগেই ঈশান বলে উঠলো,
_”ভালো তুমি যাকেই বাসো না কেন মিস স্কলার্শিপ নাউ ইউ আর মাই লিগেল ওয়াইফ!

এতোটুকু বলেই ঈশান চোঁখে চশমা লাগিয়ে বের হয়ে গেল।আর অহনা ধপাস করে সোফায় বসে পরলো।
অহনার বুকের ভেতরটা ধুকধুক করছে! এটা কেন ঈশানকে এত কাছে পেয়ে নাকি অন্য কোন কারণে!

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।