দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৭

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৭

মীরার কথা শুনে গত রাতের সমস্ত ঘটনা মনে পড়ে যাওয়ায় ঈশান উত্তেজিত হয়ে উঠলো। হাতে থাকা ক্যানোলা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠল ঈশান। ঈশান কে উত্তেজিত হতে দেখে মীরা কিছু একটা বলতে যাবে। কিন্তু ঈশান তার আগেই মীরাকে দেয়ালের সাথে শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরল,
_”আমাকে সেফটি দিয়েছো তুমি? আমি তোমার সেফটির ধার ধারি না। আমাকে লোকে গণধোলাই দিয়েছে দেখে খুব মজা পেয়েছো তাই না?

মীরা মাথা নেড়ে না করতে লাগলো।কিন্তু ঈশান সেদিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে মীরাকে এক ধাক্কায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয়ে গেল।

ঈশান কে উত্তেজিত হয়ে বের হতে দেখে দুজন নেফ্রোলজিস্ট ডক্টর পথ আটকে দাঁড়ালো,
_”আপনি এই মুহূর্তে বাহিরে যেতে পারবেন না। কারণ আপনার কিডনি অপারেশন হয়েছে?

_”কি?

ঈশানের মাথায় যেন সপ্ত আকাশ ভেঙ্গে পড়ল!ঈশানকে থমকে যেতে দেখে দুজন ডক্টরের মধ্যে একজন (হাসান) বলল,
_”হ্যাঁ আপনি ঠিকই শুনেছেন। গত রাতেই আমরা আপনার কিডনি অপারেশন করেছি। শুধু তাই নয় ড্যামেজ হওয়া কিডনি ফেলে দিয়ে আমরা আপনাকে,,,,,,

হাসান পুরো কথা শেষ করার আগেই মীরা এসে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে হাসানকে থামিয়ে দিল। হাসান কে চুপ হয়ে যেতে দেখে ঈশান বলল,
_”কি হলো থামলেন কেন? পুরো কথা পরিষ্কার করে বলুন!
_”না মানে মীরা আপু এসেছেন। উনিই আপনাকে সবকিছু পরিষ্কার করে বলবেন।

ঈশান মুখ ঘুরিয়ে মীরার দিকে তাকালো।
_”তোমরা কি শুরু করেছো আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। আমার কি সত্যি কিডনি অপারেশন হয়েছে? নাকি তোমরা বেকার ফাইজলামি করছো?

_”ছি ঈশান! তুমি এসব কি রকম কথা বলছো। একটা অপারেশন নিয়ে তোমার সাথে আমরা মিথ্যে কথা বলবো? বাই দ্যা ওয়ে তুমি আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে যে, ব্যাথা দিয়েছো তার জন্য তো একটা সরি বলতে পারতে তাই না?

_”সরি? তোমার জানা নেই আমি কাউকে সরি বলি না?
_”হ্যাঁ জানা আছে। তুমি কাউকে সরি বলো না ঠিক আছে। কিন্তু আমরা তো একই মেডিকেলে পড়েছি তাই না?
_”একই মেডিকেলে পড়লে সরি বলতে হবে এটা কোন ডিকশনারিতে লেখা আছে?দেখো তোমার যদি আমার পেটের ইনজুরি সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু বলতে ইচ্ছা হয় তাহলে বলো ।
আর না হলে না আমি অন্য কোন উপায় জেনে নিব। কিন্তু এসব সরি আমার দ্বারা হবে না।

_”ঠিক আছে। তোমার সরি বলার কোন দরকার নেই। বলছি শোনো!
ঈশান তোমায় কে কিভাবে মেরেছে সত্যিই আমার কিছু জানা নেই। তবে তোমার পেটে প্রচন্ড রকমের আঘাতের কারণে একটা কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে। তোমার ড্যামেজ হওয়া সেই কিডনি আমরা ফেলে দিয়েছি।

কিন্তু কিডনি ডোনার না পাওয়ার কারণে আরেকটা কিডনি আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি। সুতরাং এই মুহূর্তে তোমার বডিতে শুধু মাত্র একটাই কিডনি রয়েছে। আর এটা তোমার শরীরের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সো মিস্টার পারফেক্ট একটু বুঝে শুনে তো এটিটিউড দেখাও।

মীরার এরকম ঠেস দেওয়া কথা ঈশান কে কাঁটার মত করে আঘাত করল। মীরার দেওয়া এই ছোটখাটো আঘাত টা ঈশান মেনে নিতে পারলোনা। ওয়েটিং রুমের ওয়ালে লটকে থাকা টিভি টাকে তুলে মাটিতে আছাড় মারল ঈশান।

_”আমার বডিতে শুধুমাত্র একটা কিডনি আছে। তাই আমাকে নিয়ে মজা করছো তাইনা? তুমি ঈশানকে ঠেস দিয়ে কথা বলো! তোমাকে তো আমি ছাড়বো না।
ঈশান কে এভাবে উত্তেজিত হতে দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেল। ঈশান কে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মীরা দুজন স্টাফ কে বলল,

_”ওকে আপনারা ধরুন! কেবিনে নিয়ে জোর করে এই ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দিন। আশা করছি এরপরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মীরার কথা অনুযায়ী ঈশান কে ধরাধরি করে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হল।
ঈশান চলে যাওয়ার পর হাসান বলল,

_”আপু আপনি উনাকে মিথ্যে কেন বললেন? অথচ আমরা উনার বডিতে কিডনি ট্রান্সফার করেছি।
_”সেই কৈফিয়ৎ কি আমি আপনাকে দিব? আমি যেভাবে বলেছি সেভাবেই চলতে দিন।
_”ঠিক আছে না হয় সেভাবেই চলবে। তবে আমার তো জানার দরকার আছে এই মিথ্যে বলার উদ্দেশ্যটা কি। কারণ এটা কিন্তু একরকম মেন্টালি ডিপ্রেশন। যেটা আমাদের মিথ্যের কারণে উনাকে ভুগতে হবে।
_”দেখুন এই মুহূর্তে এত কিছু আমি বলতে পারব না। দয়াকরে বিষয়টা আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক! আর পরবর্তীকালে আমি আপনাদের সবকিছু পরিষ্কার করে বলবো। তবে এই মুহূর্তে ঈশান এটাই জেনে থাকুক ওর বডিতে কিডনি আছে শুধুমাত্র একটা।

মীরার এরকম অদ্ভুত কথার কোন মানে খুঁজে পেল না হাসান। তবে আর কোন কথাও বাড়ালো না। কারণ হাসান ভালো করেই জানে মীরার জেদের কাছে তার কোনো কথাই টিকবে না।

*পরদিন সকাল ছয়টায় ঈশানের ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই মীরাকে খবর দেওয়া হল।
_”হ্যালো ঈশান! এখন কেমন লাগছে তোমার?
_”আই এম ওকে।
_”হ্যাঁ আমি জানি তুমি সব সময় ঠিক আছো। তবুও প্রশ্ন করছি। একটু সোজা করে তো উত্তর দিতেই পারো। সব সময় এভাবে কথা বলতে তোমার কি ভালো লাগে?
ঈশান মীরার কথার কোন উত্তর দিল না।

ঈশান কে চুপ থাকতে দেখে আরিয়ান বলল,
_”মীরা ঈশান এখন ভালো আছে তো তাই না?
_”হ্যাঁ আঙ্কেল। ঈশান একদম ঠিক আছে। তাছাড়াও সামান্য একটা ধকলে আমাদের মিস্টার পারফেক্ট এর কি আর এমন বড় কিছু হতে পারে!

মীরার দুষ্টু মিষ্টি কথায় সবাই হেসে উঠলো। মিরা যখন ঈশানের পরিবারের সাথে হাস্যকৌতুকে ব্যস্ত ,ঠিক তখন একজন নার্স দৌড়ে আসলো।
_”ম্যাডাম 205 নাম্বার কেবিনের পেশেন্টের অবস্থা খুবই খারাপ! ওই যে মিস অ,,,,,,,,
_”থাক। নাম বলতে হবেনা জেরিন। তুমি কি মনে করো আমার স্মৃতি শক্তি এতটাই দুর্বল? আমি জানি 205 নাম্বার কেবিনে কোন পেশেন্ট আছে। ননসেন্স একটা!
_”সরি ম্যাডাম! আমি আসলে সেটা বুঝাই নি আপনাকে।
_”থাক আর কোনো কিছু বলতে হবেনা। যাও এখন তুমি আমার সামনে থেকে।

মীরাকে এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করতে দেখে আরিয়ান বলল,
_” আহ্ মীরা ছাড়ো না! সামান্য একটা বিষয় নিয়ে তুমি এরকম ওভার রিএক্ট কেন করছ? তাছাড়াও পেশেন্টের নামতো আমরা বলেই থাকি। এতে কাউকে অপমান করা তো উদ্দেশ্য হয় না।
_”না ওই আর কি আঙ্কেল মাঝে মাঝে অকারনে মাথাটা গরম হয়ে যায়।
_”এত মাথা গরম করলে জীবনে বড় ডাক্তার হবে কি করে?

আরিয়ানের কথা শুনে মীরা মাথা নিচু করে হেসে দিল।
_”ঠিক আছে আংকেল আমি তাহলে উঠেছি। আমার পেশেন্ট কে দেখে আসি।
_”দাঁড়াও! আমিও তোমার সাথে যাব। সিরিয়াস পেশেন্ট তো দুজন মিলে একসাথেই দেখি।
_”না আঙ্কেল। আপনার যাওয়ার কোন দরকার নেই। আমি একাই সামলে নিতে পারব। তাছাড়াও আপনি ঈশানের কাছে থাকলেই বেশি ভালো হবে।

কথাটা বলেই মীরা দ্রুত বের হয়ে চলে গেল। আরিয়ান কিছুটা অবাক হলেও সেদিকে কোনো তোয়াক্কা করল না।

দশ দিন পরে ঈশানকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হলেও অহনাকে একমাসেও রিলিজ দেওয়া হলো না।
অহনার শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকে যেতে থাকলো। অহনার অবস্থার এরকম অবনতি দেখে মিলির সন্দেহ হল। নিজের সন্দেহের উপর ভিত্তি করে মিলি মীরা কে বলল,

_”দেখুন ম্যাডাম অহনার অবস্থা আমার কাছে বেশি একটা সুবিধার লাগছে না। আমি জানি অহনার বড় কিছু একটা হয়েছে। হয়তোবা সেটা আপনি আঙ্কেল আন্টির থেকে গোপন করেছেন। কিন্তু আমাকে পরিষ্কার করে বলুন প্লিজ!
মিলির কথা শুনে মীরা কিছুটা টাশকি খেলো। নিজেকে বহুকষ্টে স্বাভাবিক অবস্থায় রেখে মীরা বলল,

_”অহনার কিছুই হয়নি। তবে চোট টা বড় ধরনের ছিল। তাই সারতে একটু দেরি হচ্ছে। তবে চিন্তার কারন নেই। খুব দ্রুতই আমরা অহনাকে রিলিজ দিয়ে দিব।
মীরার কথা শুনে মিলি আর কিছুই বলল না।

অন্যদিকে ঈশান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতেই মেডিকেল আসা-যাওয়া শুরু করে দিল। প্রত্যহ ক্লাসে অহনাকে উপস্থিত না দেখে ঈশান কিছুটা অবাক হল। তবে মনে মনে বুঝতে পারল মেডিকেল owner এর ছেলেকে মার খাইয়ে ভয়ে পালিয়ে আছে অহনা।

তবে অহনার আসা না আসা নিয়ে ঈশানের বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই। তবে মাথাব্যথা আছে উইক আউট মেডিকেল কলেজের। কারণ তাদের এক এবং একমাত্র আশা হচ্ছে অহনা।অহনার এভাবে মেডিকেল অনুপস্থিত থাকাতে আরিয়ান বুঝতে পারলো ঈশানের এই দুরবস্থার জন্য অহনাই দায়ী। তবে ঈশান যেহেতু অহনা কে কিছু বলছে না। তাই আরিয়ান আগবাড়িয়ে আর কিছু করলো না।

দীর্ঘ দু’মাস পরে হসপিটাল থেকে ছাড়া পেল অহনা। অহনা সুস্থ হয়ে ফিরে আসায় বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু খুশি নেই শুধুমাত্র মিলির মনে। কারণ মেডিকেল এক্সাম এগিয়ে এসেছে। মাত্র ১০ দিন বাদেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আর অহনা প্রায় আড়াই মাসের ক্লাস মিস করেছে। এই অসুস্থ অবস্থায় না পড়ে যদি অহনা এক্সাম দেয় কোনভাবেই পাশ করার সম্ভাবনা নেই।আর পাস না করলে কি হতে পারে সেটা অহনা নিজেই সব থেকে বেশি ভালো জানে।

অহনা বাড়ি ফিরে আসার পর মিলি দৌড়ে গিয়ে অহনা কে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু অহনা শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মিলিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
_”খবরদার মিলি! তুই ভুলেও আমার কাছে আসবি না। তুই ভুলে যা আমরা দুজন বন্ধু। আজকের পর থেকে আমাদের মাঝে আর কোনো বন্ধুত্ব বেঁচে নেই। সেদিন রাতেই তুই আমার মন থেকে মরে গেছিস।

অহনার কথা শুনে মিলি কান্নায় ভেঙে পড়ল।
_”অহনা তুই আমাকে এভাবে ভুল বুঝিস না। একবার তো আমাকে পরিষ্কার করে বলার সুযোগ দে।
_”আর কি সুযোগ চাচ্ছিস তুই? জানিস তোর জন্য ঈশান স্যারের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে? স্যার আর আমার সম্পর্কটা আগের থেকেও বেশি বিষাক্ত হয়ে গেছে! শুধুমাত্র তোর জন্য।

_”হ্যাঁ ঠিক আছে। সব অন্যায় আমি করেছি। মেনে নিচ্ছি আমি তোর কথা। কিন্তু এসব কিছু আমি নিজ ইচ্ছেতে করিনি। আমাকে করতে বাধ্য করা হয়েছে।
_”তোকে এসব করতে বাধ্য করা হয়েছে তাইতো? আচ্ছা তুই কি আমাকে বাচ্চা ভাবিস যে, তুই আমাকে যা বুঝাবি আমি তাই বুঝবো।
_”তোর যা ইচ্ছে মনে করতে পারিস। কিন্তু আমি একদম সত্যি কথা বলছি। প্লিজ আমাকে একটু বিশ্বাস কর! এতটুকু বলেই মিলি আবার কাঁদতে শুরু করলো।
মিলিকে এভাবে কাঁদতে দেখে অহনার হৃদয় গলে গেল। অহনা কিছুটা হেলান দিয়ে বসে মিলির কাঁধে হাত রেখে বলল,

_”ঠিক আছে। তাহলে পরিষ্কার করে বল কে তোকে এসব কিছু করতে বাধ্য করেছে।
_”বললে তুই আমার কথা বিশ্বাস করবি? আবার তো হাজারটা প্রশ্ন করতে শুরু করে দিবি।
_”আগে বলে তো দেখ।
_”রিজওয়ান স্যার । উনি নিজে বলেছেন আমাকে এসব কিছু বলতে।
_”কি?
_”হ্যাঁ এটাই সত্যি।
_”কিন্তু রিজওয়ান স্যার এরকম একটা কাজ কেন করবেন? আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না।
_”আমি যতোটুকু বলেছি ততটুকুই ঠিক। এতে কোনো মিথ্যে নেই। কিন্তু কোনটা কেন এসব কিছু আমি জানিনা।

অহনা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কিন্তু সেটা মিলিকে বুঝতে দিল না। তবে অহনার ভাবমূর্তি পরিবর্তন দেখে মিলি ঠিকই বুঝতে পেরে গেল।
_”অহনা একটা কথা বলি তোকে?
_”হ্যাঁ বল।
_”যা হয়ে গেছে সেটা কি তুই আর পরিবর্তন করতে পারবি?
_”না তা তো পারবোই না।
_”তাহলে এক কাজ করো।দশদিন বাদেই তো এক্সাম। তুই বরং যতোটুকু পারিস আমার থেকে সাজেশন নিয়ে পড়তে শুরু করে দে।
_”ঠিক আছে তুই যা বলিস তাই হবে।

অহনা মেডিকেলে উপস্থিত না হয়ে বাসায় বসেই পড়তে শুরু করে দিল। কারণ মেডিকেলে আসা-যাওয়া করাটা অহনার জন্য যথেষ্ট কষ্টকর ছিল!

যথাসময়ে পরীক্ষার দিন অহনা মেডিকেলে উপস্থিত হল। অহনাকে দেখামাত্রই সহপাঠীরা সবাই এলোমেলো হয়ে গেল। একেকজনের একেকরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অহনা হাঁপিয়ে উঠলো। অবশ্য অহনা কে এতদিন পরে মেডিকেল উপস্থিত হতে দেখে আশেপাশে গুঞ্জনেরও শেষ নেই।

বিরতিসহ দীর্ঘ ২০ দিন সময় নিয়ে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এই পরীক্ষা চলাকালীন সময় গুলোতে অহনা একবারের জন্যও ঈশানকে দেখতে পেল না। যদিও অহনার চক্ষু আশেপাশে শুধু ঈশানকেই খুঁজেছিল।

শেষ দিনের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অহনা রিজওয়ানের কেবিনে গেল। অহনাকে দেখামাত্রই রিজওয়ান দাঁড়িয়ে গেল। নিজের সিট ছেড়ে উঠে এসে হাসতে হাসতে রিজওয়ান অহনাকে বললো,

_”আমি জানতাম অহনা তুমি আমার কাছে আসবে। আমি তো তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। এখন বলো চা খাবে না কফি?
_”স্যার আমি কিছু খেতে আসিনি। আমি শুধু জানতে এসেছি আপনি কেন এরকম করলেন?
_”সরি! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না ।
আমি কি করেছি।
_”স্যার আমি জানি আপনি সবটা বুঝতে পারছেন। তবু না বুঝার মতো আচরণ করছেন।
_”হ্যাঁ ঠিক ধরতে পেরেছ। এখন বলো কি জানতে চাও?
_”স্যার আপনি নিজের ব্যাপারে এত বড় একটা মিথ্যে কথা কেন বলালেন মিলিকে দিয়ে? আপনার এই একটা মিথ্যে কথার জন্য ঈশান স্যারের সাথে কত কি হয়ে গেল।
_”দেখো অহনা! ভাইয়ার সাথে যা কিছু হয়েছে তাতে সত্যিই আমার কোন হাত নেই।তবে আমি মিলিকে দিয়ে বা তোমার ছোট বোনকে দিয়ে যা কিছু করিয়েছি সেটা তোমার ভালোর জন্যই করেছি। কারণ তোমার সামনে অনেক বড় বিপদ আছে। একজন টিচার হিসেবে স্টুডেন্টের সামান্য উপকার করলাম ব্যাস এটাই!

_”কিন্তু স্যার,,,,,
_”আর কোন কিন্তু নয় অহনা।রিজওয়ান অহনাকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।অহনা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে মেডিকেল থেকে বাড়ি চলে আসলো।

এক্সাম শেষ হওয়ার পর এক সপ্তার জন্য মেডিকেল বন্ধ দেওয়া হলো। কিন্তু বন্ধের প্রতিটা মুহূর্ত অহনার কাছে জীবননাশক বিষের মতো মনে হতে লাগল। অহনার চোখ স্বয়নে জাগরণে শুধুমাত্র একবার ঈশানের দর্শন পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকার কারণে অহনা আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ল।

*প্রায় এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর মেডিকেল খুলে গেল। অন্যান্য দিনগুলোর মতো অহনা আর মিলি একসাথেই মেডিকেল উপস্থিত হল।সহপাঠীরা সবাই পরস্পরের সাথে প্রায় এক সপ্তাহ পর দেখা হওয়ায় খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলো। কিন্তু অহনার সেদিকে কোন মন নেই। অহনার এরকম উদাসীন ভাব সবাইকেই অবাক করছিল। এরকম উচ্ছ্বাস , প্রাণবন্ত একটি মেয়ের হঠাৎ পরিবর্তন কেইবা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে!

মেডিকেল খোলার পর প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেল। কিন্তু একদিনো ঈশান ক্লাস এ আসলো না।আর অন্যদিকে পরীক্ষার রেজাল্টও প্রায় তৈরি হয়ে গেল। ঈশান কে ক্লাসে আসতে না দেখে অহনা ঈশানের কেবিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাস শেষ হওয়ার পর অহনা মিলিকে একা বাড়ি ফিরে যেতে বলল। যদিও মিলি অহনাকে ছেড়ে একা বাড়ি ফিরে যেতে কিছুতেই রাজি ছিল না। কিন্তু অহনার ধমকের সামনে মিলির দৃঢ় প্রত্যয় টিকতে পারল না।

মিলি চলে যাওয়ার পর অহনা সোজা ঈশানের কেবিনে চলে গেল। ঈশানের কেবিনের নিকটবর্তী হওয়া মাত্রই তিন/চার জন মোটা দেহ বিশিষ্ট লোক অহনার পথ আটকে দাঁড়ালো। তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল,
_”স্যারের অনুমতি ছাড়া ভেতরে যেতে পারবেন না।
অহনা তাদের কাছে অনেক অনুনয় বিনয় করতে লাগলো।
_”প্লিজ আমাকে একটু স্যারের কাছে যেতে দিন! স্যার আমাকে অনেক ভুল বুঝে আছেন। পারমিশন চাইলে স্যার কখনোই আমাকে ভেতরে যেতে দিবেন না। আপনারা একটু বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ! আপনাদের কোন দোষ হবে না। আমি বলব আমি জোর করে ভিতরে ঢুকে গেছি।

অহনার এতো আকুতি-মিনতি দেখে তাদের ভেতরে কিছুটা মায়ার সঞ্চার হওয়াতে তারা অহনার পথ ছেড়ে দিল। অহনা তাদের প্রতি খুশি হয়ে গেট খুলে কেবিনের ভিতরে ঢুকে গেল। অহনাকে দেখামাত্রই ঈশান দাঁড়িয়ে গেল,

_”তুমি? এখানে কেন এসেছো? কি চাও তুমি আমার কাছে? আর কেনই বা বিরক্ত করছো আমাকে?
_”স্যার আপনি আমার কথাগুলো একবার শুনুন! হয়তো আমার কথাগুলো শুনলে আপনার এত রাগ আর অবশিষ্ট থাকবে না।
_”আমি তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। আই জাস্ট হেট ইউ! চলে যাও আমার সামনে থেকে। আর ভবিষ্যতে কখনোই আমার সামনে আসবে না।

ঈশানের কথা শুনে অহনা কাঁদতে কাঁদতে ঈশানের দু’পা জড়িয়ে ধরল।
_”স্যার প্লিজ আমাকে একটা চান্স দিন! আমি একটু পরিষ্কার করে বলতে চাই সবকিছু। তখন হয়তো আপনার এই রাগগুলো আর থাকবে না।

_”দেখো অহনা তুমি সবগুলো এক্সামে খারাপ করেছো। তোমাকে পাশ করিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কেন স্বয়ং আরিয়ান স্যারের পক্ষেও সম্ভব নয়। আমার পা ছাড়ো। আর ভবিষ্যতে কখনো এরকম কুপ্রস্তাব নিয়ে আমার সামনে আসবে না।
_”মানে? স্যার আপনি এসব কি বলছেন? এখানে আমার পরীক্ষার কথা কেন,,,,,,
_”জাস্ট শাট আপ। না বোঝার ভান করছো তাইনা? লজ্জা করে না তোমার?এক্সামে তোমাকে পাস নাম্বার উঠিয়ে দেওয়ার জন্য তুমি আমার কাছে নিজেকে বিক্রি করতে চাইছো? ছিঃ তুমি এতো নোংরা !
তোমার এই সুন্দর চেহারার পিছনে যে কত কালো একটা চরিত্র আছে সেটা আজকে সবাই দেখে নিলো। পিছনে একবার তাকিয়ে তো দেখো!

অহনা পিছনে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল! ঈশানের কেবিনের দরজা খোলা। মেডিকেলের সমস্ত স্টাফ, সিনিয়র, জুনিয়র সহ আরো অনেক স্টুডেন্ট উপস্থিত রয়েছে। সেই সাথে আরিয়ান খান, মীরা, আর রিজওয়ান খানও রয়েছে।

অপমানে অহনার চোখ থেকে অনবরত জল গড়িয়ে পরতে থাকলো। অহনা ঈশানের পা ছেড়ে দিয়ে ওপরে মুখ তুলে কিছু একটা বলতে গেল ।কিন্তু তার আগেই ইশান অহনাকে দুই হাত দিয়ে টেনে উপরে তুলল। অহনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঈশান অহনাকে এত জোরে ধাক্কা দিল যে, ঈশানের কেবিনে থাকা টেবিলের সাথে পেটে আঘাত পেয়ে অহনা রিজওয়ান এর পায়ের
কাছে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরল।

ঈশান নিজের টেবিলের ওপর থেকে একটা পেপার হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,
_”আমি এই মেডিকেলের একজন ওনারশিপ এর পক্ষ থেকে এই নোংরা চরিত্রের মেয়েটির রাসটিকেট করছি। আজকের পর থেকে এই মেয়েটি আমাদের মেডিকেলে থাকবে না ‌। দ্যাটস মাই ফাইনাল ডিসিশন।

রিজওয়ান এগিয়ে এসে ঈশানের হাত থেকে পেপারটা নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল।
_”আমিও এই মেডিকেলের একজন ওনারশিপ এর পক্ষ থেকে এই রাসটিকেট কে রিজেক্ট ঘোষণা করছি। অহনা এই মেডিকেলে আছে ।আর এই মেডিকেলেই থাকবে।

_”তুমি আমার মুখের উপর কথা বলছ? এত সাহস তুমি কোথা থেকে পাও?
_”ভাইয়া যে সাহস তুমি রাসটিকেট করার জন্য পেয়েছো। সেই একই সাহস আমি তোমার মুখের ওপর কথা বলার জন্য পেয়েছি।

ঈশান আর রিজওয়ান এর মাঝে প্রচন্ড রকমের তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়।দুই ছেলের মাঝে কঠিন পর্যায়ের তর্ক দেখে আরিয়ান এগিয়ে আসে রিজওয়ানের গালে একটা চড় মেরে বসে।
_”আমার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার বড় ভাইয়ের সাথে তর্ক করছো।
আর ঈশান তুমি কি ভুলে যাচ্ছো এই মেডিকেল টা আমার। তাই রাসটিকেট করার সিদ্ধান্তটা আমি একাই নিতে পারি।

_”বেশ! তাহলে তুমি তোমার মেডিকেল নিয়ে থাকো। আমি লন্ডন ফিরে যাচ্ছি।

ঈশান ক্ষিপ্ত হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে নে। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্রই অহনা ধীর কণ্ঠে একবার স্যার বলে ডাক দিল। কিন্তু পরক্ষনেই ডান হাতটা পেটের উপর রেখে শক্ত করে চাপ দিয়ে আর্তনাদ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল অহনা!

অহনাকে এভাবে জ্ঞান হারাতে দেখে ঈশান থমকে দাঁড়ালো। কিন্তু তখনো নির্ভীক রইল ঈশান।অহনার অবস্থা সুবিধাজনক না দেখে রিজওয়ান অহনাকে কোলে তুলে নিল।

দ্রুত থার্ড নাম্বার ফ্লোরে এনে একটা কেবিনে অহনাকে শুয়ে দিল রিজওয়ান। অহনাকে শুইয়ে দিতেই মীরা চিৎকার করে উঠলো।
_”হেই রিজওয়ান আপনার শার্ট রক্তে লাল হয়ে গেছে।
_”রক্ত? কিন্তু রক্ত কোথা থেকে,,,,, এতোটুকু বলতেই রিজওয়ানের চোখ পরল অহনার পেটের দিকে। সাদা ইউনিফর্ম টা রক্তে ভিজে গেছে। অহনার ইউনিফর্ম রক্তে ভিজে চুপসে যেতে দেখে মীরা আতঙ্কগ্রস্ত কন্ঠে বলল,
_”ও মাই গড !
অহনার তো একটা অপারেশন হয়েছিল।
_”হোয়াট? কি অপারেশন হয়েছিল অহনার? আর কবেই বা হল?
_”কবে আবার ?
আড়াই মাস আগে আমি নিজে দুজন নেফ্রোলজিস্ট ডক্টরের সাথে অহনা আর ঈশানের কিড,,,,,,,,,

এতোটুকু বলতেই মীরা চমকে উঠলো। ঈশান দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে ঈশানের গম্ভীর দুটো চোখ তখনও অহনার দিকেই নিবদ্ধ!

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।