দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৪

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৪

সবাইকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অহনা দৌড়ে এসে বলল,
_”আপু আমার কাজ শেষ। এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দাও।
_”হ্যাঁ সবই তো ঠিক আছে অহনা। একবার পিছনে ফিরে তো দেখ কাকে প্রোপোজ করেছিস।
_”কাকে আবার যাকে হাতের কাছে পেয়েছি তা,,,, এতটুকু বলেই অহনা থমকে গেলো। ঈশান গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো এতো লাল হয়ে আছে যেন আগুন বেরোচ্ছে! ঈশান ধীরে ধীরে অহনার কাছে এগিয়ে আসতে থাকে।

ঈশান কে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে অহনা মনে মনে বলতে থাকে,
_”আমি শেষ আজ! শেষ পর্যন্ত ঈশান স্যার কে,,,,,,,
এতটুকু বলেই অহনা সেন্সলেস হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।
রিসিপশনে এত গোলমাল দেখে আরিয়ান খান নিচে নেমে আসে।
_”কি ব্যাপার এত হট্টগোল কেনো? ঈশান কি হয়েছে এখানে?
_”না সেরকম কিছু হয়নি। ওই মিস স্কলার্শিপ হঠাৎ করে সেন্সলেস হয়ে গেছে এই আর কি!
_”কি? সেন্সলেস হয়ে পড়েছে?
আরিয়ান সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলো!
_”ও আচ্ছা এই তাহলে আমাদের ঈশানের মিস্ স্কলারশিপ!
আরিয়ান খান কিছুটা আড়চোখে ঈশানের দিকে তাকাতেই ঈশান মুখটা বাঁ দিকে ঘুরিয়ে নিলো। আরিয়ান খান আর কোন কিছু না বলে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেলো।

আর অন্যদিকে অহনার বন্ধুরা অহনাকে ধরাধরি করে তার বাড়িতে নিয়ে গেল।
জ্ঞান ফিরার পর অহনা নিজেকে বেডরুমে আবিষ্কার করলো। আশেপাশে একবার চোখ বুলাতেই ডানপাশে চোখ আটকে গেল। বাবা-মা আর ছোট বোন সোহানা বসে আছে। সবাইকে যতটা না অস্থির দেখাচ্ছে তার থেকেও বেশি দুঃখী দেখাচ্ছে অহনার বাবাকে।
অহনাকে এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে অহনার বাবা কাঁদতে শুরু করে দিল।

_”মা রে আমি আজকে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! তোর দুজন বন্ধু তোকে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গিয়েছে। তোর এমন দুরবস্থা দেখে আমি ভেবেছিলাম তোর না জানি কি হয়েছে।

অহনা ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা উঠিয়ে শক্ত করে বাবার বাঁ’ হাতটা চেপে ধরলো।
_”বাবা তুমি সব সময় আমাকে নিয়ে একটু বেশি ভাবো। আমার সেরকম কিছু হয়নি।
_”তাহলে কি রকম কি হয়েছে? সেটা অন্তত পরিষ্কার করে একটু বল।
_”বললাম তো বাবা কিছুই হয়নি।
_”যদি কিছু নাই হয়ে থাকে, তাহলে তোর বন্ধুরা তোকে অজ্ঞান অবস্থায় কেন বাড়ি নিয়ে আসলো?
_”অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে এসেছে কারণ,,,,
এতোটুকু বলতেই অহনার মনে পড়ে গেল মেডিকেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা। অহনার যতটা না ভয় হচ্ছে তার থেকেও বেশি লজ্জা হচ্ছে গোটা ঘটনার জন্য!

_”ছি আমি ঈশান স্যারের সাথে এটা কিভাবে করলাম! স্যার কে কিভাবে মুখ দেখাবো আমি?
_”কি হয়েছেরে মা? কাকে মুখ দেখানোর কথা বলছিস?
_”বাবা যাও তো এখন। আমাকে একটু একা থাকতে দাও। কিছু হয়নি। মাথা ঘুরে গিয়েছিল তাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। ব্যাস এতটুকুই।

অহনার বাবা-মা আর কোন কিছু না বলে উঠে চলে আসলো। অহনা তখনও গোটা বিষয়টা নিয়ে ভাবতে লাগলো। কিছু সময় পর মিলি আসলো অহনার কাছে।
_”অহনা আজকে রিসিপশনে যা কিছু হয়েছে সত্যি খুব খারাপ হয়েছে! তোর বন্ধু হয়েও তোকে বাঁচাতে পারলাম না। অবশ্য বাঁচানোর জন্য তো কোনো চেষ্টাও করিনি।
_”এসব কথা রাখ। আমার সত্যি আর ভালো লাগছে না এসব!
_”তুই যখন চাইছিস না তখন বলবো না। কিন্তু আমার ভীষণ ভয় করছে তোকে না আবার আরিয়ান স্যার রাসটিকেট করেন।
_”করলে সিনিয়রদের কে করবে। আমাকে কেন করবে? ওদের রেগিং এর জন্যই তো এসব হয়েছে। শাসন করে না বলে ওরা সবাই মাথায় উঠেছে।
তুই যা ।এই মুহূর্তে মেজাজটা অনেক খারাপ আছে।

মিলি আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। অহনা দীর্ঘ ১০ দিন মেডিকেলে গেলো না। আর অন্যদিকে অহনার মেডিকেলের না যাওয়া বিষয়টা যথেষ্ট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য মেডিকেল থেকে কল আসলো অহনা যেন খুব দ্রুত মেডিকেলে যায়।

মেডিকেল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে অহনা দীর্ঘ দশ দিন পর মেডিকেল উপস্থিত হল। অহনা মেডিকেল ঢুকা মাত্রই রিসিপশনে অহনাকে নিয়ে ফিসফিস শুরু হয়ে গেল। যদিও বিষয়টা অহনার দৃষ্টি এড়ালো না।
অহনা কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ক্লাস রুমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে। কিন্তু থার্ড ফ্লোরে ঈশানের সাথে জোরে একটা ধাক্কা খেয়ে অহনা মাটিতে পড়ে যায়।
অহনাকে দেখে ঈশান প্রচন্ড রেগে যায়।

_”তোমার সমস্যা কি বলতো? কি চাও তুমি আমার কাছে? যখনই তোমার সাথে আমার দেখা হয় একটা না একটা কিছু ঘটেই যায়। আমার পুরো লাইফটা হেল করে দিচ্ছ তুমি! তোমার মত ক্যারেক্টার লেস মেয়ে আমি আমার জীবনে আরেকটা দেখিনি!
_”স্যার আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন! আমাকে একটু এক্সপ্লেন করার সুযোগ দিন। সেদিন রিসিপশনের যা কিছু হয়েছে আপনার সাথে তাতে আমার কোন,,,
_”দোষ নেই,,,, ব্যাস এটাই তো বলবে তুমি?
নিজেকে তো সবসময় নির্দোষ প্রমাণ করতে চাও। আসলে তুমি যে কেমন সেটা আমার জানা হয়ে গেছে।

_”স্যার দয়া করে আমাকে একটু বলার সুযোগ দিন! সেদিন আমাকে চোখ বেঁধে দিয়েছিল,,,,,
_”শাট আপ! আমি তোমার কোন কথাই শুনতে চাইনা। আর কার উপর দোষ চাপাতে চাও তুমি? তোমার জন্য আমার কত অপমান হয়েছে জানো? আই জাস্ট হেট ইউ! তুমি এখন এই মুহূর্তে আমার সামনে থেকে চলে যাও।না হয় তোমাকে না,,,,,,,,,,,

এতোটুকু বলে ঈশান অহনার কাছে তিন পা এগিয়ে আসলো। ঈশান কে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে অহনা পিছনে হটতে গিয়ে সিড়িঁর কোনায় পা আটকে পরে যেতে নিল। কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে অহনাকে ঈশানের ছোট ভাই ডক্টর রিজওয়ান খান ধরে ফেলল।
অহনাও বাঁচার জন্য কোন কিছু না ভেবে রিজওয়ান কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।

অহনাকে কোনভাবে সেভ করে রিজওয়ান ঈশানের কাছে এগিয়ে আসে।
_”ভাইয়া তুমি এটা কি করতে যাচ্ছিলে? একটা মেয়ে স্টুডেন্টের গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলে তুমি। ছিঃ তোমার থেকে এটা আশা করা যায় না!
_”আচ্ছা আমার থেকে এটা আশা করা যায় না?আর তুমি যে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছ সেটা তোমার থেকে খুব ভালো আশা করা যায়!
_”দেখো ভাইয়া আমি ওকে সেফটি দিয়েছি। পড়ে গেল ওর অনেক বড় ক্ষতি হতে পারতো।
_”ক্ষতি হলে ওর হত। তাতে তোমার কি? মেয়েদের প্রতি তোমার দেখছি একটু বেশিই দয়া!
_”তোমার সাথে তর্ক করা টাই বেকার!

এতোটুকু বলে রিজওয়ান অহনার কাছে এসে কাঁধে হাত রাখলো।
_”অহনা আই এম ভেরি ভেরি সরি! তুমি প্লিজ মনে কিছু নিও না।
_”না ঠিক আছে স্যার ।আপনি কেন সরি বলছেন? আপনি তো কোন অন্যায় করেননি।
_”তবু ভাইয়া যেটা করেছে সেটা তো অন্যায়। ভাইয়ার পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি।

রিজওয়ান কে এভাবে অহনার গায়ে হাত দিয়ে কথা বলতে দেখে ঈশান প্রচন্ড রেগে যায়। এগিয়ে এসে এক ঝটকায় রেজওয়ানের হাতটা অহনার কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয় ।
_”মেয়েদের গায়ে হাত দিয়ে কথা বলাটা কোন ধরনের সভ্যতা?
ঈশান প্রচন্ড রকম ক্ষিপ্ত হয়ে রিজওয়ান এর শার্টের কলার চেপে ধরল। অহনা এগিয়ে এসে ঈশানের হাত দুটো টেনে রেজওয়ানের কলার থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
_”রিজওয়ান স্যার আমার কাঁধে হাত রেখেছেন।আর মাঝে মাঝে আরিয়ান স্যারও আমার কাঁধে হাত রাখেন। তাতে তো কোন প্রবলেম হয় না। তাহলে কি আপনার বাবার ও সভ্যতা নেই?
_”শাট আপ তুমি একদম কথা বলবে না। ভিখিরির আবার বড় বড় কথা।
_”তাহলে ভিখিরির গায়ে কে হাত দেবে কে দেবে না সেটা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন?
_”ওকে ফাইন! দেখালাম না কোনো মাথাব্যথা। তোমার বিষয়ে মাথাব্যথা দেখানোর কোন ইন্টারেস্ট ও আমার নেই। ডিসগাস্টিং!

ঈশান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কেবিনে চলে গেল। অহনাও কোন কিছু না বলে ক্লাস রুমে চলে আসলো।কিন্তু মনের অজান্তেই অহনার চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরল। অহনা ক্লাস রুমে ঢুকতেই সহপাঠীরা সবাই অহনাকে ঘিরে ধরে।
_”অহনা সেদিন তোর সাথে যা কিছু হয়েছে সত্যি খুবই খারাপ হয়েছে! আমরা তোকে হাজার চেষ্টা করেও সতর্ক করতে পারিনি। কারণ সেরকম কোনো উপায় ছিল না। আজকে সিনিয়রদের জন্য তোর একটা বদনাম হয়ে গেল। আর তুই এই বদনাম মেনেও নিচ্ছিস।

_”থাক না ছাড় এসব কথা! যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তাছাড়াও কি আর এমন হবে। হয়তো ঈশান স্যার দুই একটা কটু কথা বলবেন! সেগুলো আমি হজম করে নিব।কোন সমস্যা নেই।

সহপাঠীরা আরো কিছু বলতে গেল কিন্তু তার আগেই ঈশান ক্লাসে ঢুকলো। ঈশান কে ক্লাস রুমে ঢুকতে দেখে সবাই যার যার জায়গায় গিয়ে তাড়াতাড়ি বসে পরলো।
ঈশান একবার আড়চোখে অহনার দিকে তাকালো।
কিন্তু অহনা তখনও মাথা নিচু করে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইলো।

ঈশান ক্লাসে ঢোকার মিনিট দশেক পরেই দুজন লোক এসে ক্লাস রুমে ঢুকলো।
_”কি ব্যাপার আপনারা কারা? আর ক্লাস টাইমে ঢোকা নিষেধ সেটা জানেন না?
_”ক্ষমা করবেন স্যার!আরিয়ান স্যার আমাদের বলেছেন এ ক্লাসের স্টুডেন্টস এর বায়োডাটা রেজিস্ট্রি করার জন্য নিয়ে যেতে।
_”হুঁ ঠিক । তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে চলে যান।

দুজন লোক এক এক করে সব স্টুডেন্টস দের দাঁড় করিয়ে তাদের নাম-ঠিকানা নোট করে নিচ্ছিলো।
এক পর্যায়ে অহনার পালা আসলো। অহনা দাঁড়াতেই দুজনের মধ্যে একজন প্রশ্ন করল।
_”কি নাম তোমার?
_”মিস স্কলার্শিপ!
অহনা এই নাম বলতেই ঈশান দুটো হেঁচকি দিয়ে উঠলো। ঈশান কে এভাবে হেঁচকি দিতে দেখে অহনা খুব লজ্জা পেয়ে গেল!
_”কি? এটা আবার কেমন নাম?
_”না মানে সরি! আমার নাম অহনা রহমান।

অহনার কান্ড-কারখানা দেখে ক্লাসের সবাই হাসতে শুরু করে দিলো। বিষয়টা অহনাকে যথেষ্ট বিব্রত করছিলো।সমস্ত স্টুডেন্ট এর বায়োডাটা নোট করে লোক গুলো চলে গেল। তাদের সাথে সাথে ঈশানও চলে গেল।

ঈশান চলে যাওয়ার পর মিলি অহনার কাছে এসে বসলো।
_”অহনা তোর মনটা কি এখনো খারাপ?
_”না আমি একদম ঠিক আছি। তবে জানিস একটা জিনিস খুব খারাপ লাগছে! ঈশান স্যার আর রিজওয়ান স্যার দুজনেই তো ভাই। কিন্তু দুই ভাইয়ের মাঝে এত তফাৎ কেন? রিজওয়ান স্যার বড্ড ভালো মানুষ! আর এই ঈশান স্যার??? ছি মানুষ এত খারাপ হয়!

_”থাক না। তুই কেন অযথা এসব নিয়ে পড়ে আছিস? যা হয়েছে সব কিছু ভুলে যা।

অহনা আর কোন কিছু বলল না। মেডিকেল ছুটি হওয়ার পর অহনা আর মিলি দুজনেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো। ফার্স্ট ফ্লোর এ নামা মাত্রই দুজনে ঈশানের মুখোমুখি হয়ে গেল। ঈশান একবার অহনার দিকে তাকালো। তারপর মিলিকে নিজের কাছে ডাকলো।

_”শোনো তোমার বান্ধবীকে বলে দিও মেডিকেল পড়াশোনার জায়গা। স্যারদের গা ঘেষাঘেষি করার জায়গা না। ভবিষ্যতে যদি এরকম নোংরামু দেখি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মেডিকেল থেকে বের করে দেব। মাইন্ড ইট!

ঈশান এতটুকু বলেই নিজের কেবিনে চলে গেল। অহনা কাঁদতে কাঁদতে মিলিকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
_”মিলি ঈশান স্যার কেন আমার সাথে এরকম করছেন? আমি স্যারের কি এমন ক্ষতি করেছি?
_”তুই কাঁদিস না প্লিজ! আগে বাড়ি চল তারপর দেখছি।

মিলি অহনাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলো। সারাদিন অহনা মুখ গোমরা করে থাকল। হাসল না কোন কথাও বলল না। অহনার মন খারাপ মানে মোটামুটি বাড়ির সবার মন খারাপ!

আর অন্যদিকে ঈশান বাড়ি ফিরতেই রিজওয়ান ঈশানের পথ আগলে দাঁড়ায়।
_”ভাইয়া তুমি আজ মেডিকেলে যা করেছ খুবই অন্যায় করেছো। একটা মেয়ের সাথে কেউ এভাবে দুর্ব্যবহার করে? লাস্ট মোমেন্টে তুমি ওকে যে থ্রেট করেছ সেটাও আমি শুনেছি।

_”হ্যাঁ শুনেছো সো হোয়াট? আমি যা বলেছি সব কিছু অন্যায় তাই না? তাহলে ওই মেয়েটা যা করেছে সেগুলো অন্যায় না?

_”ভাইয়া ওই মেয়েটা তো আমাকে ধরে নি। আমি একজন টিচার হিসাবে ওই মেয়েটাকে ধরে ছিলাম। আর সেটাও শুধুমাত্র ওকে শান্তনা দেওয়ার জন্য। এতে ওর ভুলটা কোথায় বলো?

_”রিজওয়ান তুমি একদম ওই মেয়ের সাপোর্টে কোন কথা বলবে না। ওই মেয়েটাকে আমার একদম সহ্য হয় না। যদি মেনেও নি আজকের ঘটনায় ওর কোন দোষ ছিলনা। তাহলে সেদিন এর রিসিপশনের ঘটনায়? সেদিনও কি ওর কোন দোষ ছিলনা? ও সবার সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে ।আর তারপর কিস করেছে।

_”ভাইয়া ভাইয়া কুল ডাউন!
সেদিন যখন অহনা তোমাকে হাগ দিয়েছে কিস করেছে ওর কিন্তু চোখ বাঁধা ছিল। ও জানতই না ও কাকে কি করছে।যদি জানতে পারত এটা তুমি, তাহলে আমার বিশ্বাস ও ওসব করা তো দূরে থাক তোমাকে স্পর্শ করেও দেখতো না।

_”ঠিক আছে মেনে নিলাম না জেনে ও এসব করেছে। কিন্তু এসব কিছু করার কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল? এগুলো কি কোন ভদ্র মেয়ের কাজ?

_”ভাইয়া তুমি তো বিদেশে পড়াশোনা করেছ। আমাদের দেশের অবস্থা তুমি কিছুই জানো না। এখানে সিনিয়ররা জুনিয়ারদের রেগিং করে। আর অহনাকেও রেগিং করা হয়েছে। বেচারী বাধ্য হয়েছে এ সবকিছু করতে। ও নিজের ইচ্ছায় এ সব কিছুই করেনি।

তার উপর তুমি ওর সাথে প্রচন্ড রকমের দুর্ব্যবহার করেছো। মেয়েদের হৃদয়টা কিন্তু কোমল হয়। ওর ভীষণ খারাপ লেগেছে! তুমি কিন্তু অবশ্যই ওর কাছে সরি বলবে।

_”কি ওকে সরি বলবো?আমি এতটাও পাগল নই যে ওর মত একটা মেয়েকে সরি বলবো।

ঈশান আর কোন কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেল। কিন্তু রুমে গিয়ে ঈশান কিছুতেই স্বস্তিতে বসতে পারল না। সর্বক্ষণ অহনার চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকল।
ঈশান মনে মনে ভাবতে লাগল।

_”আচ্ছা আজকে যখন রিজওয়ান মিস স্কলারশিপের কাঁধে হাতে রেখেছিল আমার এত খারাপ লেগেছিল কেন?
টিচার তো এরকম ভাবে স্টুডেন্টের কাঁধে হাত রেখেই থাকে। আমি তো এসব আরো অনেকবার দেখেছি। কই এতো মাথা গরম হয়নি তো। তাহলে আজকে,,,

ও বুঝেছি আমার তো এমনিতেই মেজাজ খারাপ ছিল। তাই হয়তো স্বাভাবিক বিষয় টা অস্বাভাবিক লাগছিল।
আচ্ছা আমি কি মিস স্কলারশিপের সাথে একটু বেশি দুর্ব্যবহার করে ফেলছি? আজকে মেয়েটার চোখে জল দেখেছি। হয়তো আমার ব্যবহারে খুব কষ্ট পেয়েছিল।
কাল কে মেডিকেলে গিয়ে কি একবার সরি বলবো?

না সরি শব্দটা আমার সাথে যায় না। সরি বলা যাবেনা। তাহলে কি বলবো? দেখো তুমি তো আমার স্টুডেন্ট। তোমার সাথে আমার আর একটু ইজি বিহেভ করা উচিত! সেদিনের ব্যবহারটা একটু কঠোর হয়ে গিয়েছিল।

হ্যাঁ ঠিক আছে এটাই বলব। ওসব সরি আমার দ্বারা হবে না। ঈশান সবকিছু ভেবে রাতে শুয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারলো না। অকারনেই অহনা ঈশানের মনের মাঝে লুকোচুরি খেলতে থাকলো।

রাত প্রায় বারোটা বাজতে শুরু হয়েছে। আর অন্যদিকে তুমুল পর্যায়ের ঝড়-বৃষ্টি।
কিন্তু কিছুতেই অহনার ছোট বোন সোহানা বাড়িতে ফিরছিল না।সোহানা বাড়িতে না ফিরায় সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। অহনা তার বাবাকে বললো,
_”বাবা সোহানা তো সব সময় কোচিং থেকে ঠিক ৯ টায় ফিরে আসে। তাহলে আজ এত দেরি কেন হচ্ছে?

অহনার বাবা কিছু একটা বলতে যাবে। তারা আগেই বিধস্ত সোহানা কে বুকে জড়িয়ে ধরে মিলি ভিতরে ঢুকলো। সোহানা কে এরকম অবস্থায় দেখে অহনা আঁতকে উঠলো।

_”কিরে বোন তোর কি হয়েছে? তোর কাপড়-চোপড়ের এই অবস্থা কেন?
মিলি অহনার সামনে এসে দাড়িয়ে বলল,
_”এখনো বুঝতে পারছিস না এই অবস্থা কেন?
_”না সত্যি বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে মিলি আমাকে একটু বল।
_”সোহানাকে রেপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি আর বাবা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণে সোহানা বেঁচে গেছে।

_”কি বলছিস তুই এ সব? আমার এই বোন টা
কে রেপ করতে চাইবে কে?
_”জানতে চাস কে রেপ করতে চেয়েছিল তোর বোনকে?
_”হ্যাঁ বল। কে আমার বোনের এত বড় ক্ষতি করতে চেয়েছিল।
_”তুই যেই স্যারের গুনোগান করছিলি আজকে। সেই মহামান্য রিজওয়ান স্যার তোর বোনকে রেপ করতে চেয়েছিল।

_”কি? এসব কি বলছিস তুই? অহনা দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে বসে পরলো।
_”হ্যাঁ তুই ঠিকই শুনছিস। ঈশান স্যার খারাপ হলেও সামনে থেকে আঘাত করে। কিন্তু রিজওয়ান স্যার এত মহৎ যে পিছন থেকে ছুরি মারে।

অহনা আর কোন কিছু না বলে জীপারটা পড়ে ঝড়ের রাতে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পিছন থেকে অহনাকে বাবা-মা মিলি সবাই অনেক ডাকতে থাকে। কিন্তু অহনা তাদের কারো ডাকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করে দৌড়ে সোজা ঈশানের বাড়ির সামনে এসে থামে।
অহনা চিৎকার করে ঈশানের নাম ধরে ডাকতে থাকে।

_”মিস্টার ঈশান খান! কোথায় আপনি? নিচে নেমে আসুন।আজ আপনার প্রতিপত্তির দাপট আর এই ভিখিরির চিৎকার দুটো একসাথে মিলে মিশে যাক। আসুন নিচে নেমে আসুন!

অহনার চিৎকার শুনে আরিয়ান খানের বাড়ির সবাই নিচে নেমে আসে। সবার সাথে সাথেই ঈশান ও নিচে নেমে আসে।

অহনা বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপসে আছে। ঈশান হাঁ করে অহনার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে।
_”মিস স্কলার্শিপ কে বৃষ্টিতে ভিজলে সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর লাগে!আমি তো এটাও বুঝতে পারছি না ঘুমে জাগরণে সব সময় আমার ফিলিংস এ তুমি কেন আসো!

ঈশান কে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে অহনা ঈশানের কাছে তেঁড়ে আসলো।ঈশান কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অহনা ঠাস করে ঈশানের ডান গালে একটা চড় বসিয়ে দিল।

_”ডক্টর হয়েছেন সবাই। কিন্তু কারো চরিত্রের কোন ঠিক নেই। মেয়েদের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখলে চোখ ফেরাতে পারেন না তাই না? অসভ্য কদাকার চরিত্রের লোক আপনারা!

ঈশান একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো! কোন কারন ছাড়াই ঈশানের এক চোখ থেকে জল গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। এটা কেন অপমানে নাকি অভিমানে ঈশান নিজেও জানেনা!

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।