দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৩

দুই মেরুর এক মেরু – পর্বঃ-০৩

ঈশান প্রচন্ড রেগে মিটিং রুম থেকে বের হয়ে সোজা বাড়ি চলে আসলো। ঈশান কে এভাবে ক্ষ্যাপা দেখে বাড়ির সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লো।
আরিয়ান খান এগিয়ে এসে ঈশানের কাঁধে হাত রেখে বললো,
_”কি ব্যাপার ঈশান এত রেগে আছো? কোন ঝামেলা হয়েছে মেডিকেলে? তাছাড়াও তোমার টুয়েন্টিফোর্থ ফ্লোর এ থাকার কথা। ওখানেই তোমার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেন তোমার বাড়ি থেকে মেডিকেল যাওয়া-আসায় কোন কষ্ট না হয়। তাহলে তুমি হুট করে বাড়ি কেন আসলে?
_”না এমনি তোমাদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো।
_”কি? আমাদের দেখতে ইচ্ছে করছিলো তোমার? এটাও এখন আমার বিশ্বাস করতে হবে? যাইহোক কথা না পেঁচিয়ে বলো কি হয়েছে?
_”না সেরকম কিছু না ।ওই আর কি মিস স্কলারশিপ একটা বাংলা শব্দ বলেছিলো। কিন্তু কেউ সেটার অর্থ বলতে পারে না। তাই মাথাটা গরম হয়ে গেছে।
_”হ্যাঁ বাবা সবই ঠিক আছে। কিন্তু এই মিস স্কলার্শিপ টা আবার কে?

আরিয়ান খানের প্রশ্নে ঈশান কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। হাঁ করে আরিয়ান খান এর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। কিন্তু উত্তর দেওয়ার কোন ভাষাই খুঁজে পেলো না।

ঈশান কে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান খান আবার একই প্রশ্ন করলো।
কিন্তু ঈশান কোন উত্তর না দিয়ে দৌড়ে উপরে চলে গেলো।
ঈশান কে এভাবে হুট করে চলে যেতে দেখে সবাই খুব হতভম্ব হয়ে গেলো। তবে আরিয়ান খানের মনে তখনও একই প্রশ্ন।
_”এই মিস স্কলার্শিপ টা আবার কে?

ঈশান উপরে এসেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে পরলো। এই মুহূর্তে ঈশানের এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে অহনা সম্পর্কে ভালো করে জানা।ফেসবুকে অহনার নাম সার্চ দিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতে হঠাৎ ঈশানের চোখ পরলো অহনার রিয়েল আইডির দিকে।
_”ওহ্!
তাহলে মিস স্কলার্শিপ সোশ্যাল মিডিয়াতেও আছে। অবশ্য চেহারা দেখেই বুঝা যায় এ যে পাকনামীর শীর্ষে অবস্থানকারী নি। ঈশান আর দেরি না করে দ্রুত অহনার আইডি ঘাটতে শুরু করলো।

অহনার আইডি ঘাটতে ঘাটতে ঈশান ভাবতে লাগলো,
_”একটা মানুষ লেখে একরকম কিন্তু কাজ করে আরেক রকম। এটা কিভাবে সম্ভব? এরকম মধুমাখা স্ট্যাটাস দেখে কে ভাবতে পারবে এই মিস স্কলার্শিপ যে একটা ডেঞ্জারাস মেয়ে!

ঈশান আনমনে শুধু অহনার এই আজব কাণ্ডকারখানা নিয়েই ভাবতে লাগলো। আর অন্যদিকে অহনা দেরি করে বাড়িতে ফিরায় অহনার বাবা ফিরোজ রেজা প্রচন্ড পরিমাণ ক্ষেপে গেলো। অবশ্য এই ক্ষেপে যাওয়ার পিছনে মিষ্টিটা মিলিই ঢেলেছে।
অহনার বাবা রাগে গজগজ করতে করতে বললো,

_”তুই জানিস না তোকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়? তাহলে মিলির সাথে না এসে একা কেন বাড়ি ফিরলি? আর ওই এলাকার মাস্তান গুলো তো রীতিমতো তোকে ইভটিজিং করতেই থাকে। তোর যদি কিছু হয়ে যায় আমাদের কি হবে কখনো একবার ভেবে দেখেছিস?
একটুকু বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লো অহনার বাবা।

বাবা কে এভাবে কাঁদতে দেখে অহনা হাসতে হাসতে বললো,
_”বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আচ্ছা আমার কি হবে বলতো? তুমি তো জানোই দৈনিক পাড়ার এই মাস্তান ছেলেগুলোকে হ্যান্ডেল করতে করতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর ওদেরকে দেখলে আমার ভয় করে না। আর ওরাও আমাকে ইভটিজিং করে না।

_”মানে কি বলতে চাস তুই? পাড়ার এই বজ্জাত গুলো তোকে আর আসা-যাওয়ার পথে ইভটিজিং করে না?
_”আরে না বাবা করে না। আমার কথা তোমার বিশ্বাস হয়না?
_”হ্যাঁ তোর কথা বিশ্বাস হয়। কিন্তু ওরা তো কে ইভটিজিং না করে ছেড়ে দেয় কেন এটাই তো বুঝতে পারলাম না।
_”বুঝতে পারো নি তো? বলছি শোনো!
যে যেমন তার সাথে তার উল্টো ব্যবহার করতে হয়।
_”মানে তোর কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। একটু পরিষ্কার করে বল মা!
_”বলছি বলছি শোনো!
দেখো বাবা ওরা হচ্ছে মাস্তান। ওদের অনেক পাওয়ার আছে। তাই ওরা আমাদের থ্রেট করে ধমকি দেয়। এই মুহূর্তে আমাদের কি করা উচিৎ? ওদের সাথে ঝামেলা করা উচিত? না ভুল।

ঠিক সেরকম ভাবেই আমি ওদেরকে হ্যান্ডেল করছি। গত একমাস আগে আমি ওদেরকে বলেছিলাম,
_”দেখো জোর করে মারামারি করে তো আর ভালোবাসা পাওয়া যায় না। আমরা তো একই এলাকায় থাকি। আমি এদিক দিয়ে প্রতিদিন আসা-যাওয়াও করছি। সময় নাও আস্তে আস্তে ভালোলাগা ভালোবাসা সবই তৈরি হবে।

বাবা জানো আমি ওই কথা বলার পর থেকে আজ পর্যন্ত ওরা আমাকে কেউ ইভটিজিং করেনি। তাই বললাম ,যে যেমন তার সাথে তার উল্টো ব্যবহার করতে হয়। শুধু একবার আমার মেডিকেল টা শেষ হতে দাও। তারপর রাতারাতি এখান থেকে পালিয়ে যাবো আমরা।
মেয়ের বুদ্ধি দেখে আবেগে অহনার বাবার চোখ বেয়ে দু ‘ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো।

বাবা কে কোনমতে দুধ কলা ভাত বুঝিয়ে অহনা ঘরে এসে ঢুকলো। অহনা ঘরে ঢুকতেই মিলি এসে হানা দিলো।
_”কিরে অহনা তোর মতিগতি তো কিছুই বুঝিনা। আমাকে একা বাড়ি ফিরতে বললি। ঠিক আছে আমি একাই না হয় বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু তুই এতো সময় কি করেছিস মেডিকেলে?
মিলির কৌতুহল দেখে অহনা হাসতে হাসতে বললো,
_”কালকে মেডিকেল গেলেই সব কিছু বুঝতে পারবি। এখন যা আমাকে আর বিরক্ত করিস না।
মিলি আর কোন কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

*রাতে ডিনারের টেবিলে বসে ঈশানের বাবা ঈশান কে প্রশ্ন করলো,
_”আচ্ছা ঈশান তুমি এক মিস স্কলারশিপের কথা বলেছিলে। এই মিস স্কলার্শিপ টা কে? একটু পরিষ্কার করে বলোতো।

আচমকা বাবার এরকম প্রশ্নে ঈশানের খাবার উজিয়ে উঠার উপক্রম হলো। নিজেকে বহু কষ্টে কন্ট্রোল করে ঈশান বললো,
_”ছাড়ো ওটা সেরকম কোনো ব্যাপার না। তুমি আমাকে বলতো এই অহনা মেয়েটা কেমন?
_”তুমি কার কথা বলছো? অহনা রহমান?
_”হ্যাঁ ওই আর কি।
_”ওর ব্যাপারে যদি বলতে শুরু করি তাহলে আর শেষ হবে না।
বাবার কথা শুনে ঈশান মনে মনে বললো,
_”সে তোমাকে বলতে হবে না বাবা।ওর ব্যাপারে শুরু করলে যে শেষ হবে না সেটা আমিও জানি। দুনিয়ার অসভ্য ,বেয়াদব একটা মেয়ে!
ঈশান কে কিছু একটা ভাবতে দেখে ঈশানের বাবা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
_”কি ব্যাপার কি ভাবছো? মাত্রই না আমার কাছে অহনা সম্পর্কে জানতে চাইলে।
_”হ্যাঁ জানতে চাইলাম তো।
_”শোনো ঈশান। ওর মত মেয়ে দ্বিতীয় আরেকটা হয় না।
_”(ঈশান মনে মনে) সে আমি ভালো করেই জানি বাবা। এরকম ফালতু পিস একটাই হয়।
_”ওর ভিতরে যা আছে অন্য কোন মেয়ের ভিতরে তা নেই।
_”(ঈশান মনে মনে) এটাও আমার জানা হয়ে গেছে বাবা। এরকম ক্যারেক্টার লেস স্বভাব অন্য কোন মেয়ের ভিতরে যদি থাকতো তাহলে আর কোন মেয়ের বিয়ে হতো না।
_”শোনো ঈশান! তুমি কিন্তু অহনার দিকে অনেক খেয়াল রাখবে। ও আমাদের মেডিকেলের গৌরব। সাহসী, শান্তশিষ্ট ও ভদ্র স্বভাবের মেয়ে! ওর জন্যই আমাদের মেডিকেল দেশের সেরা মেডিকেল হয়ে আসছে প্রত্যেকবার। শী ইজ এ বিউটিফুল এন্ড ট্যালেন্টেড গার্ল।

বাবার মুখ থেকে অহনার প্রশংসা শুনে ঈশানের মুখ বেঁকে যাওয়ার উপক্রম হলো। কারণ ঈশান তো এতক্ষণ বাবার পক্ষ থেকে অহনার ব্যাপারে যতসব খারাপ মন্তব্য করে যাচ্ছিলো। কিন্তু ঈশানের সমস্ত মন্তব্যকে ভুল প্রমাণিত করলো ঈশানের বাবা।
ঈশান কে এভাবে খামোশ থাকতে দেখে ঈশানের বাবা বললো,
_”কি হলো ঈশান? তোমার ব্যাপার-স্যাপার আমি কিছুই বুঝতে পারিনা। নিজেই অহনা সম্পর্কে জানতে চাইলে।আর যখন অহনার সম্পর্কে বলতে শুরু করলাম এমন একটা ভাব করলে যেন, তুমি এসব শুনতে প্রস্তুতই নও।

ঈশান কোন কিছু না বলে খাবার টেবিল ছেড়ে নিজের রুমে চলে আসলো । বাবার কথা গুলো তখনও ঈশানের মাথার ভেতর ঘুরঘুর করতে লাগলো। অহনা সম্পর্কে এতো ভালো কথা ঈশান কিছুতেই মানতে পারছে না।
_”আচ্ছা অহনা সম্পর্কে এতো ভাল কথা বাবা কি করে বললো? বাবা কি জানেনা ও যে একটা বেয়াদব মেয়ে। অবশ্য জানবেই বা কি করে ওতো ভিতরে এক আর বাহিরে আরেক।
ধুর আমিই বা ওকে নিয়ে কেন ভাবছি। ওর তো খেয়ে কোন কাজ নেই সেজন্য মানুষের পিছনে পড়ে থাকে। কিন্তু আই এম দ্যা বিজি ম্যান। আমার অনেক কাজ আছে। সো ওকে নিয়ে ভেবে নিজের সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন আমার নেই।

ঈশান বহু কষ্ট করে অহনার ভূত টা কে মাথা থেকে নামালো। পরদিন যথারীতি নিয়মে অহনার আগেই ঈশান মেডিকেলে পৌছে গেলো। আর মেডিকেলে পৌঁছানো মাত্রই রিসিপশনে বসে থাকা সবার গুড মর্নিং বলা। আর ঈশান গুড মর্নিং এর জবাব না দিয়েই নিজের কেবিনে চলে যাওয়া। সবকিছু আগের মতোই হলো।

ঈশান মেডিকেল পৌঁছানোর ঠিক দু’ ঘন্টা পরে অহনা মেডিকেল আসলো। অহনা ক্লাস রুমে ঢুকতেই সহপাঠীরা অহনাকে ঘিরে ধরলো।
_”অহনা কালকের ফাস্ট চ্যাপ্টারটা গুলিয়ে ফেলেছি সেকেন্ড চ্যাপ্টার এর সাথে। ঈশান স্যার এসে তো বারোটা বাজিয়ে ফেলবে। প্লিজ একটু ফাস্ট চ্যাপ্টারটা আরেকবার বুঝিয়ে দে না!

অহনা একবার সবার দিকে তাকালো। তারপর রবিনের সানগ্লাসটা চোখে লাগিয়ে বাঁ’হাতটা জিপারের পকেটে ঢুকিয়ে বললো,
_”স্টুপিড কোথাকার! ক্লাসে তোমাদের মন কোথায় থাকে? তোমরা জানো না আমি এক কথা দুই বার বলি না।আর এক পড়া দুইবার বুঝাইও না । ক্লাসটা শুরু করো আগে তোমাদেরকে তো আজ দেখে নিবো!

অহনার কপি স্টাইল দেখে সবাই জোরে জোরে হাসতে লাগলো। সবাইকে হাসাতে পেরে অহনা তো মহাখুশি।
_”হয়েছে না? পুরো ঈশান স্যারের মতো হয়েছে না?
ওই হুঁকোমুখো টা কে কপি করাটা তো ভাগ্যের ব্যাপার।
কিরে তোরা আমার সাথে সহমত?

অহনা দুইবার প্রশ্ন করলো কিন্তু কেউ কোন উত্তর দিলো না। সবাইকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে অহনা প্রচণ্ড রেগে গেলো।
_”কিরে সবাই এমন চুপ করে আছিস কেনো? আর এমন ভ্যাবলার মতো আমার পিছনে তাকিয়ে আছিস কেনো?
মিলি কিছুটা বিড়বিড় করে বললো,
_”তুইও একবার তোর পিছনে তাকা। তাহলেই বুঝতে পারবি আমরা কেন তাকিয়ে আছি।

অহনা পিছে তাকিয়েই হোয়াইট বোর্ডের সাথে একটা টক্কর খেলো। ঈশান দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঈশান কে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অহনা আস্তে আস্তে বললো,
_”আপনাকে না খুব চেনা চেনা লাগছে! কোথায় যেন দেখেছিলাম। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে! আপনি কি বলিউডের সালমান খান?
_”জাস্ট শাট আপ! কি হচ্ছে এখানে এসব? আর তুমি চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে এসব কি করছো? আমাকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে তাইনা?
_”ছি ছি স্যার! আপনি এসব কি রকম কথা বলছেন? আপনাকে আমি ব্যঙ্গ করতে যাব কেন? আমিতো আপনাকে কপি করেছি।
_”হ্যাঁ কেন কপি করেছ? তুমি জাননা উইদাউৎ পার্মিশন কাউকে কপি করা অন্যায়? এইজন্য আমি তোমার বিরুদ্ধে পুলিশ নোটিশও করতে পারি।
_”তাই নাকি স্যার? সত্যি বলতে এটা তো জানতাম না। স্যার আমাকে একটু পারমিসন দেন আমি সেকেন্ড ফ্লোরে যাবো।
_”আশ্চর্য তো! একেতো তুমি একটা অন্যায় করেছো। তার ওপর এখন ক্লাসটা টাইমে সেকেন্ড ফ্লোরে যেতে চাচ্ছো। সেকেন্ড ফ্লোরে কেন যাবে এখন?
_” স্যার আমি একটু আরিয়ান স্যারের কাছে যেতে চেয়েছিলাম। কারণ যেকোনো মুহূর্তে উনার বিরুদ্ধে পুলিশ নোটিশ হতে পারে। তাই আমি আগে থেকেই
উনাকে সতর্ক করে আসতে চাচ্ছি।
_”হোয়াট? উনার বিরুদ্ধে কেন পুলিস নোটিশ হবে? আর কেই বা করবে?
_”কে আবার আপনি করবেন।
_”আমি করবো মানে? আমি এ কথা কখন বলেছি আমি স্যারের নামে নোটিশ করবো?
_”সব কথা কি আর বলা লাগে স্যার? কোন কথা এ রকম আছে না বলা ছাড়াই হয়ে যায়।
_”তোমার কোন কথাই আমি বুঝতে পারিনা।পারলে পরিষ্কার করে বলো না হলে জায়গায় গিয়ে বসো।
_”স্যার বলছি বলছি।
দেখুন গুরুজনেরা বলেছেন আমরা যেন আমাদের গুরুকে অনুসরণ করি।আর আরিয়ান স্যার আমাদের বলেছেন আমরা যেন ভবিষ্যতে আপনার মত একজন সাইকোলজিস্ট ডক্টর হই। আমরা যেন আপনাকে অনুসরন করি। আর সেজন্যই আমি আপনাকে কপি করছিলাম। এখন যদি কোন পুলিশ নোটিশ হয়। তাহলে তো সেটা আরিয়ান স্যারের বিরুদ্ধে হবে। তাই আমি আগে স্যার কে সতর্ক করতে চাচ্ছিলাম।

অহনার কথা শুনে ঈশান হতভম্ব হয়ে গেল! কি বলবে সবকিছু গুলিয়ে ফেলল। কিছুসময় চুপ থেকে ঈশান বলল,
_”হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে মহাজ্ঞানী!
আপনি এবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসুন।

অহনা হাসতে হাসতে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। ঈশান ক্লাস শেষ করে মিলিকে নিজের কাছে ডাক দিলো।
_”তুমি তো বেশিরভাগ সময় মিস স্কলারশিপ এর সাথে থাকো তাইনা?
_”জি স্যার? আমি আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারিনি। মিস স্কলার্শিপ কে? আমিতো এই নামে কাউকে চিনি না স্যার।
_”না ওই অহনা আর কি!
_”জি স্যার আমরা একসাথেই থাকি।
_”আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি কি জানো কাট্টামারা শব্দের অর্থ কি?
_”কি? স্যার এরকম শব্দ তো জীবনে শুনিনি। তবে যতটুকু মনে হচ্ছে এটার অর্থ হয়তোবা কাইট্টা মাইরা ফেলা।

মিলির এরকম অদ্ভুত ব্যাখ্যা শুনে অহনার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। অহনা ঘন ঘন ঢোক গিলতে থাকলো। ঈশান একবার আড়চোখে অহনার দিকে তাকালো। তারপর আবার বললো,
_”বাহ দুজনে থাকো একসাথে। কিন্তু এক শব্দের অর্থ দুজন বললে দুই রকম। ব্যাপারটা কি?
_”জি স্যার অহনা এটার কোন অর্থ বলেছে?
_”হ্যাঁ বলেছে তো। তোমার বান্ধবী বলেছে এই শব্দের অর্থ নাকি সুপার হ্যান্ডসাম।
_”জি স্যার। অহনা বলেছে মানে এটার অর্থ সত্যিই সুপার হ্যান্ডসাম।
_”শাট আপ। অহনা বললেই সবকিছু হয়ে যায়। ননসেন্স কোথাকার! যাও নিজের জায়গায় গিয়ে বসো।

গতকালের মতো আজও ঈশান ক্লাস থেকে রেগেই বের হলো । ঈশান চলে যাওয়ার পর সবাই অহনাকে বুঝালো এভাবে ঈশানকে বিরক্ত না করার জন্য।

*এভাবেই আরো কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলো। এই দিনগুলোতে ঈশান একবারের জন্যও অহনার দিকে তাকায় নি। যদিও অহনার প্রতি ঈশানের এত রাগের কারণ অহনার কাছে অজানা।

একদিন মেডিকেলে ঢোকার পর অহনা দেখলো ওদের ক্লাসরুমে সিনিয়ররা গোল হয়ে বসে আছে। সবাইকে এভাবে জটলা পাকিয়ে বসে থাকতে দেখে অহনা মিলিকে বললো,
_”কিরে এখানে কি হয়েছে? এরা এভাবে এখানে জটলা পাকিয়ে কি করছে?
_”কি করছে আবার? বসে বসে জুনিয়রদের রেগিং করছে।
_”কি রেগিং? ও মা রে আমি তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাই!
অহনা দৌড়ে পালানোর আগেই দুজন মেয়ে অহনা কে ধরে ফেললো। সবার মাঝখানে বসে থাকা শিখা বললো,
_”কিরে অহনা পালাচ্ছিস কেনো?আমি তো শুনেছি তুই নাকি বর্তমানের মেডিকেলের সবথেকে ট্যালেন্টেড স্টুডেন্ট। তাহলে তুই জানিস না আমাদের সাথে বেয়াদবি করার পরিণতি কি?
_”সরি শিখা আপু! আর কখনো এরকম হবে না।
এবারের মত মাফ করে দাও।
_”ঠিক আছে মাফ করে দিবো শর্ত আছে। যদি শর্তটা মানতে পারিস তবে মাফ পেয়ে যাবি। না হলে তোর নামে এমন বদনাম রটাবো যে, এই মেডিকেলে টিকতে পারবি না।
_”না ঠিক আছে কোন বদনাম রটানোর দরকার নেই। তুমি বরং তোমার শর্তটা বলো।

এশা এদিকে আয়। অহনার চোখটা এই রুমাল দিয়ে বেঁধে দে।
_”আরে চোখ কেন বেঁধে দিবা? শর্তের সাথে চোখ বাঁধার কি সম্পর্ক?
_”আরে থাম তুই। আগে চোখটা তো বাঁধতে দে। অহনা আর কোন কিছু বলল না। চোখ শক্ত করে বাঁধার পর শিখা অহনাকে বললো,
_”দেখ অহনা এখন আমরা তোকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নিয়ে ছেড়ে দিবো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ছেড়ে দেওয়ার পর সর্বপ্রথম তুমি যাকে স্পর্শ করবি। তাকে তোর হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করতে হবে। তারপর হাগ দিতে হবে। যদি তোর ভালোবাসা বিশ্বাস করতে না চায় তাহলে কিস করতে হবে। তবে হ্যাঁ চোখ খোলার আগে এসব করতে হবে।

_”আপু শর্ত টা একটু বেশি কঠিন হয়ে গেল না। সেটাও আবার গ্রাউন্ড ফ্লোরে। যদি আরিয়ান স্যার দেখে ফেলেন অনেক বড় কেলেঙ্কারী হবে।
_”দেখ আমরা তোকে ১০০ ভাগ গ্যারান্টি দিচ্ছি আরিয়ান স্যার এই মুহূর্তে নিচে থাকবেন না। তবুও যদি তুই না মানিস তাহলে ঠিক আছে আমরা তোর নামে ভুলভাল কথা রটাবো। আর আরিয়ান স্যার তোকে আদর করে রেখে দিবে। রাজি?

_”না ঠিক আছে আমি রেডি।যেহেতু তোমরা গ্যারান্টি দিচ্ছো আরিয়ান স্যার এই মুহূর্তে নিচে থাকবে না।
অহনাকে চোখ বেঁধে লিফটে করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামিয়ে দিলো সিনিয়ররা।
অহনা এদিক ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে হাঁটতে লাগলো। অহনার এরকম দুরবস্থা দেখে রিসিপশনের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো। তবে কেউ বুঝতে পারল না এভাবে চোখ বেঁধে হাঁটার কারন।

হাতরাতে হাতরাতে হঠাৎ অহনার হাত কারো হাতে স্পর্শ করলো। সাথে সাথে অহনা সেই হাত শক্ত করে টেনে ধরলো। কোন কিছু না ভেবেই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো।
_”আমি সত্যিই জানিনা আপনি কে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনার গায়ের অদ্ভুত সেই গন্ধ শুঁকেই আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি। আই লাভ ইউ!

এতোটুকু বলেই অহনা উঠে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অজ্ঞাতনামা সেই ব্যক্তি কে।
অহনাকে দুই-তিনজন টেনে পেছনে নিয়ে গেল। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল,
_”এই কি করছো তুমি ?তোমার কি মাথা খারাপ? কাকে প্রপোজ করছো তুমি জানো?
অহনা সবাইকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল,
_”সবাই সরে যান আমার কাছ থেকে। আমি সত্যিই ওনাকে ভালোবাসি। ছাড়ুন আমাকে!

অহনা সবাইকে ধাক্কা দিয়ে আবার দৌড়ে আসলো সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছে।
_”আপনার বিশ্বাস হয় না আমি আপনাকে ভালোবাসি? প্রমাণ চান আমার ভালোবাসার? ঠিক আছে নিন প্রমাণ দিচ্ছি। এতটুকু বলেই অহনা সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির দুই গালে দুটো চুমু দিয়ে দিলো।

অহনা এবার মহাখুশি। কারণ তার সব কাজ শেষ। অহনা পিছনে ঘুরে চোখের বাঁধন টা খুলে ফেললো। চোখ খুলতে অহনা দেখে সিনিয়ররা দাঁড়িয়ে আছে।সবাইকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অহনা দৌড়ে এসে বলল,
_”আপু আমার কাজ শেষ। এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দাও।
_”হ্যাঁ সবই তো ঠিক আছে অহনা। একবার পিছনে ফিরে তো দেখ কাকে প্রোপোজ করেছিস।
_”কাকে আবার যাকে হাতের কাছে পেয়েছি তা,,,, এতটুকু বলেই অহনা থমকে গেলো। ঈশান গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো এতো লাল হয়ে আছে যেন আগুন বেরোচ্ছে! ঈশান ধীরে ধীরে অহনার কাছে এগিয়ে আসতে থাকে।

ঈশান কে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে অহনা মনে মনে বলতে থাকে,
_”আমি শেষ আজ! শেষ পর্যন্ত ঈশান স্যার কে,,,,,,,
এতটুকু বলেই অহনা সেন্সলেস হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

চলবে……

গল্প: দুই মেরুর এক মেরু।
লেখা: আফরাহ্ হুমায়রা।