পাকিস্তানের বিশিষ্ট পপ শিল্পি জুনায়েদ জামশেদের তাওবা

পাকিস্তানের বিশিষ্ট পপ শিল্পি জুনায়েদ জামশেদের তাওবা

পাকিস্তানের বিখ্যাত পপ সংগীত শিল্পি জুনায়েদ জামশেদ এই তাবলীগ জামাআতের মেহনতে তার সংগীত জগত ছেড়ে এখন পুরা দস্তুর তাবলীগের দাঈ হিসেবে সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। তিনি তার এই পরিবর্তনের কথা বর্ণনা করতে যেয়ে বলেন, আমার আব্বা ছিলেন খুবই সৎ। কোন হারাম তাকে কখনাে স্পর্শ করতে পারতাে না। সুতরাং বাড়িতে সব সময় নাই নাই অবস্থা বিরাজ করত। পরিবারে এই দৈন্য দশা। দেখে আমার মাথায় নেশা চাপল টাকা কামাই করার। কি ভাবে দুই হাতে টাকা কামাই করা যায় সেই নেশা আমাকে পেয়ে বসল। ছােটো বেলা থেকে আমার গলা ছিল খুব সুন্দর। আমি সেই গলা কাজে লাগিয়ে সংগীতচর্চা শুরু করলাম। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আমার এত সুখ্যাতি হয়ে গেল যে, আমি দেশের সেরা শিল্পীতে পরিণত হলাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রন আসতে লাগল। বাংলাদেশ আর ভারত ছাড়া বিশ্বের সব দেশে গান গাইলাম। একেকটা গানে লাখ লাখ টাকা কামাই করতে থাকলাম। গাড়ি বাড়ি সবই হল। পৃথিবী জোড়া সুখ্যাতি হল। কিন্তু তার পরেও মনের পরিপূর্ণ শান্তি খুঁজে পেলাম না।

২০০৩ সালের কথা, একদিন জুন মাসের প্রচন্ড গরমে করাচীর রাস্তা দিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বাইরে তখন প্রচন্ড লু বইছে। পায়ে হাটা মানুষের সংখ্যা রাস্তায় খুবই কম পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এমন সময় দেখি তাবলীগের কিছু ভাই গাশতে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে আর তাদের শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। জামা কাপড় সব ভিজে গেছে। তাদেরকে দেখে মনে মনে বললাম, লােকগুলি পাগল ছাড়া আর কি। নিজেদের আরামও নষ্ট করছে। আবার আরেক জনকে বাড়ি থেকে বের করে তাকেও কষ্টের মধ্যে ফেলবে। পরে চিন্তা করলাম, আমি এই এ.সি. গাড়িতে কত আরামে বসে আছি কিন্তু এরা কিসের জন্য নিজেদেরকে এই কষ্টের মধ্যে ফেলেছে? একথা চিন্তা করে আমি গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে একেবারে তাদের আমীর সাহেবের সামনে গিয়ে ব্রেক করলাম, তারা হতচকিত হয়ে গেল। আমি গাড়ি থেকে নেমে তাদেরকে সালাম করে বললাম, আপনাদের এই কাজ আমার খুব ভাল লাগে,আমার জন্য দুআ করবেন। আমীর সাহেব। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে বললেন, ইনশাআল্লাহ দুআ করব। আমি চলে এলাম । তারা মসজিদে যেয়ে বলল । আজকে জুনায়েদের সাথে আমাদের দেখা হয়েছে।

মজিদের ঐ জামাআতে স্কুল লাইফের আমার এক সহপাঠি ছিল। সে। মার নাম শুনে বলল, আরে সে তাে আমার সহপাঠি। তার পিছনে হনত করা দরকার। তারপরে সে কোনভাবে আমার মােবাইল নম্বর যােগাড় করে আমার সাথে যােগাযােগ করল, আমার বাড়িতে এল এবং দীর্ঘ তিন বছর আমার পিছনে মেহনত করল। কখনাে আমার হাতে ধরল, কখনাে আমার পায়ে ধরল, কখনাে মাথার পাগড়ী খুলে আমার পায়ের কাছে রেখে দিল। বলল জুনায়েদ! এখন তুমি যে সম্মানের মধ্যে আছ, এটা চিরস্থায়ী নয়, এটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তােমাকে যে পথে আহবান করছি প্রকৃত সম্মান সে পথেই নিহিত রয়েছে। এখন হয়ত তুমি বুঝতে পারবে না, কিন্তু একদিন তােমার বুঝে আসবে যে, আমিই তােমার প্রকৃত কল্যাণকামী। আমি তাকে গলা ধাক্কা দিলাম, বাড়ি থেকে বের করে দিলাম, কিন্তু সে কিছুতেই আমাকে ছাড়লনা। তিন বছর মেহনত করার পরে আমাকে একদিনের জন্য তাবলীগে বের হতে রাজি করল। আমি একদিনের নিয়তে বের হলাম। সেই একদিন শেষ হলে আরেক দিনের জন্য অনুরােধ করল। এভাবে একদিন একদিন করতে করতে আমার চিল্লা পুরা হয়ে গেল। চিল্লা থেকে ফিরে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলাম। গান গাইতেও আর ভাল লাগেনা, আবার না গাইলেও সংসার চলবে কিভাবে? এসব চিন্তা করে মনের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলাম । মাওলানা তারেক জামীল সাহেব বার বার আমাকে অভয় দিতে লাগলেন, হিম্মত যােগাতে লাগলেন। আমি গান। গাওয়া একেবারে বন্ধ করলাম না তবে সংখ্যা কমিয়ে দিলাম। বন্ধুমহলে আস্তে আস্তে ঘােষণা করতে লাগলাম যে, এই জগত থেকে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছি।

আগের পােশাক পরিত্যাগ করে ইসলামী লেবাস ধরলাম, দাড়ি একবার | রাখি, একবার কাটি, এভাবে চলতে লাগল। ২০০৬ সালের কথা, একদিন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব জাফরুল্লাহ জামালী আমাকে ফোন করে বললেন, টিভিতে তােমাকে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতে হবে। আমি বললাম, আমি তাে গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, সেটা কেমন কথা, আমার অনুরােধ রাখবে না? আমি বললাম, আপনার অনুরােধ আমি রাখতে পারি কিন্তু আপনাকেও আমার একটা শর্ত মানতে হবে। তা হল, এই গাওয়াই হবে আমার শেষ গাওয়া। টিভিতে আমি এই সংগীত পরিবেশন করার পরে পুরা জাতির সামনে আমি ঘােষণা করে দেব যে, আজ থেকে আমি এই জগতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। তিনি আমার শর্ত মেনে নিলেন। নির্ধারিত তারিখে আমি টিভিতে ঘােষণা দিয়ে দিলাম পপ জগত থেকে সরে দাঁড়াবার । তখন আমার মনের যে কি অবস্থা হয়েছিল তা আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবনা।

শয়তান কিন্তু বসে থাকল না, আমার সংকল্প থেকে আমাকে টলাবার জন্য বিভিন্নভাবে সে জাল ফেলতে লাগল। বড় বড় অফার আসতে লাগল । একটা মাত্র গান গাওয়ার জন্য, একটা মাত্র শােতে অংশ নেওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকার প্রস্তাব আসতে লাগল । কিন্তু আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সব লােভ ত্যাগ করলাম। ইতিমধ্যে আমার ঈমানী পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল । ছেলে মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলাম বেতন না দিতে পারার কারণে, গাড়ি যেটা ছিল সেটা বিক্রি করে দিলাম। একসময় বাড়িও বিক্রি করে। দিলাম। নগদ টাকা যা ছিল তা দ্রুত শেষ হয়ে আসতে লাগল । সর্বশেষ যেদিন আমার পকেটে ১০০ টাকা ছিল সেদিন স্ত্রীর হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে বললাম এই আমার শেষ সম্বল, কাল থেকে সংসার কিভাবে চলবে তা আমি জানিনা । তুমি আমার কাছে কোন টাকা-পয়সা চাইবে না। স্ত্রী বলল, আপনাকে সে চিন্তা করতে হবে না। আজ যিনি রিযিক দিচ্ছেন আগামী কালও তিনিই রিযিক দেবেন । বস্তুতঃ আমার এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীর অবদান অনেক বেশি। তার সহযােগিতা ও সমর্থন না পেলে আমার এই রাস্তায় আসা কষ্টকর হয়ে যেত। সেই আমাকে আগের জগতে ফিরে যেতে অনুৎসাহিত করেছে। আল্লাহর উপর ভরসা করার তাগিদ দিয়েছে। সন্তানদেরকে সান্তনা দিয়েছে। তার অবদান এই জীবনে ভােলার নয়। জনাব জুনায়েদ জামশেদ বলেন, অবস্থা যখন এই পর্যায়ে এসে পৌছল, আর আমি যখন পরীক্ষার শেষ সীমায় এসে পৌছলাম তখন আল্লাহ পাকের রহমত আর মদদ, আমার শামেলে হাল হল। বস্তুতঃ আল্লাহ পাক কুরবানী চান কিন্তু তিনি কুরবানী নেন না। শুধুমাত্র বান্দাকে পরীক্ষা করতে চান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট কুরবানী চেয়েছিলেন, তিনি যখন কুরবানী দেয়ার জন্য প্রস্তুত তখনই আল্লাহ পাকের সাহায্য এসে গেছে। আগুনে পড়ার জন্য তৈরী হয়ে গেছেন আল্লাহ পাক হেফাযত করেছেন। ছেলের গলায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা দুম্বা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার কুরবানী আল্লাহ তাআলা কবুল করলেন, হারাম. পথে রিযিক তলব করা ছেড়ে দিলাম, হালাল পথে তিনি ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি এখন পায়জামা-পাঞ্জাবী তৈরী সবি। সারা পাকিস্তানে আমার ৪৫ টা শাে রূম । সবগুলি আমি চিনিও না। কোথাও আমার যাওয়াও লাগে না। আমি একেবারে অবসর। সারা বছর | তাবলীগ করে বেড়াচ্ছি। আগে গান গাওয়ার জন্য সারা বিশ্ব সফর করেছি, এখন দাওয়াতের কাজে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অগনিত মানষের আন্তরিক ভালবাসা লাভ করছি। 

শেষ পর্যন্ত ছিল এক গলা, আল্লাহ তাআলা সেটাও কাজে লাগিয়ে দিলেন। একদিন মুফতী তাকী উসমানী সাহেব ফোনে আমাকে খবর দিলেন। তার খেদমতে হাজির হলে তিনি একটা হামদ আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এটা রেকর্ড করিয়ে ফেল। হামদ রেকর্ড করিয়ে বাজারে ছাড়ার সাথে সাথে হৈ চৈ পড়ে গেল। এরপরে হামদ-নাতের এ্যালবাম তৈরী করে বাজারে ছাড়লে ২০০৭ সালে সারা পৃথিবীতে উর্দু এ্যালবামের সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড ভংগ করল। আমি তখন ইংল্যান্ডে ৭ মাসের জন্য সময় লাগাচ্ছি। এখন বাজারে আমার অনেক এ্যালবাম। আমার মৃত্যুর পরেও এগুলি মানুষের মুখে মুখে জারী থাকবে। আগে থাকত আমার গান, এখন থাকবে আমার গাওয়া গজল। কিছু দিন আগে আমি দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত মাদ্রাসা দারুল উলুম যাকারিয়ায় সফর করলাম। সেখানে প্রতিটি ছাত্রের মুখে মুখে আমার গজল। 

শুনে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। দ্বীনের খাতিরে আল্লাহ তাআলা এত সম্মান দান করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ তাআলা কারাে ঋণ বাকি রাখেন না। সাথে সাথেই শােধ করে দেন। তিনি বলেন, যে জিনিস আপনার নিকট নেই সেটা না হওয়াই আপনার জন্য উত্তম । সুতরাং সেটা পাওয়ার জন্য কখনাে লালায়িত হবেন না। জোর করে সেটা পেতে গেলে বরং হিতে বিপরীত হবে। এর জলন্ত প্রমাণ আমি। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য যেটা মুনাসিব মনে করেন সেটা অবশ্যই তাকে দিয়ে থাকেন। সুতরাং যেটা দেননি, বুঝতে হবে তাতেই মংগল নিহীত আছে। (বিগত ২১-১-০৮ তারিখে জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়ার হলরূমে জুনায়েদ জামশেদ নিজেই তার এই কাহিনী তুলে ধরেন।)