করোনায় আমাদের দুঃখ গাঁথা

করোনায় আমাদের দুঃখ গাঁথা

ইতােমধ্যে হাসপাতাল থেকে রােগীকে চিকিত্সা সেবা দিতে অস্বীকার করা শুরু হয়েছে, রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া মানুষকে সহায়তা করতে কেউ এগিয়ে | না আসার ঘটনা ঘটেছে, রােগীকে হাসপাতালে নেয়ার জন্যে প্রতিবেশীদের সহায়তা চেয়ে বিফল হতে হয়েছে, | মৃতকে দাফনে এলাকাবাসীর বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। | এই সব ঘটতে শুরু হওয়ার কারণ, এদেশে করােনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত আতঙ্ক ছড়ানাে হয়েছে। এখনও সেই আতঙ্কবাদীরা থেমে নেই। সেনসেশনাল গপ্পো লােকে ভালাে খায়, তাই লাইকশেয়ারের লােভে এই কাজটি কেউ কেউ করে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি একেবারে প্যাথােলােজিক্যাল সাইকোপ্যাথও এদেশে ফেইসবুকে সেলেব্রিটি হয়ে বসে আছে। এই সমাজের বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি সর্বহারার সমাজ, অন্য উপকার করতে না পারলেও এখানে কারাে বিপদে |

আপদে এগিয়ে আসার, দুটো কথা বলে সান্ত্বনা দেয়ার লােকের অভাব হতাে না। | কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে, রােগাক্রান্ত হলে, মারা গেলে প্রয়ােজনের চেয়ে বেশী | লােকজন এগিয়ে আসতাে অকাতরে। এই সমাজে এমন ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে গেছে, কেউ এগিয়ে আসছে না, কারণ | ফিয়ার মঙ্গারাররা ব্যাপক ক্যাম্পেইন চালিয়েছে। করােনা নিয়ে “সতর্ক” করা নয়, “আতঙ্কিত” করে তুলতে ফিয়ার মঙ্গারাররা সফল হয়েছে। এই দেশে রানা প্লাজা ধ্বসে পড়লে যথাযথ ট্রেইনিং ও হাতিয়ার ছাড়াই উদ্ধার কাজে মূল ভূমিকা রেখেছে সাধারণ জনগন।

এই দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। এখানে বন্যা-ঘূর্ণিঝড় নিয়মিত মানুষকে ঘর হারা, খাদ্য-চিকিৎসা ছাড়া অবস্থায় ফেলে। বিরাট পরিসরে যমে-মানুষে টানাটানি এখানে খুব দুর্লভ চিত্র নয়। অথচ, সামাজিকভাবে পারস্পরিক সহযােগিতার ঐতিহ্য এই জনপদের মানুষকে ঐসব দুর্যোগ মােকাবেলায় সফল করে এসেছে। অন্তত, আমি সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারি, হ্যারিকেন ক্যাট্রিনা যখন আমেরিকার লুইজিয়ানায় আঘাত হেনে নিউ অরলিয়েন্স সিটিকে চিরতরে বদলে দেয়, তখন হারিকেন-উত্তর দুর্যোগ মােকাবেলায় ফেডারেল সরকার পর্যন্ত হিমশিম খেয়েছে; সেই সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মােকাবেলায় বাংলাদেশ মডেলের কথা, বাংলাদেশে কমুনিটির মধ্যে কোঅপারেশনের সুফলের কথা সেদেশের সর্বোচ্চমহলে উচ্চারিত ও আলােচিত হয়েছে!

তা হলে, আমাদের এই সমাজকে আজ এতাে হৃদয়হীন আচরণ করতে দেখা যাচ্ছে কেনাে? যাওয়ার কারণ, ফিয়ার মঙ্গারাররা এই আতঙ্ক ছড়াতে সক্ষম হয়েছে যে, করােনার কালে কেউ কারাে সাহায্যে এগিয়ে আসা মানে নিজের ও পারিপার্শ্বের সবার নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনা! এই যে প্রবাসীদেরকে করােনা বয়ে আনার কারণে দোষারােপ করা, সেটা ঐ আতঙ্কবাদীদের কুকর্মের ফল। দুই সপ্তাহের বন্ধে লােকজন ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়ায় দোষারােপ করা, সেটাও | ঐ আতঙ্কবাদীদের কূটকৌশলের জয়। | যে দেশে মানুষ ভােট দিতে পারে না, | সে দেশে ভােটছাড়া সরকার করােনার মতাে দুর্যোগ মােকাবেলায় যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলবে বলে আশা করা যায় কীভাবে? পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই টেস্ট | কিটের ঘাটতি, তালিকা লম্বা না করে আমেরিকার নাম করছি, আমেরিকায় যথেষ্ট হারে টেস্ট করা হচ্ছে না, ফলে সংক্রমণ মােকাবেলায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে, এই অভিযােগে খােদ আমেরিকার সরকার অভিযুক্ত। সেখানে। এই দেশে টেস্ট কিট থাকবে না, এটা | কি খুব অবাক কোনাে ব্যাপার?

সােনার বাংলা থেকে ভাগ্য পরিবর্তনে গিয়ে অনেকে আবাস গড়েন যে ইতালিতে, সেখানে চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্যে হাসপাতালের সামর্থ এক পর্যায়ে ফেইল মেরেছে। এমনকি, বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব যে চায়না, সেখানে চিকিৎসা সামগ্রীর বাড়তি চাহিদা যােগান দিতে গিয়ে উৎপাদকরা হিমশিম খেয়েছেন।

কাজেই, এই ঘাের দুর্যোগের কালে, পৃথিবীর অন্যতম দুর্নীতিপরায়ণ দেশ বাংলাদেশে প্রস্তুতি থাকবে না, চিকিৎসা সেবার আয়ােজন অপ্রতুল হবে, এসবতাে অস্বাভাবিক কোনাে কিছু নয়! বিপদে দুঃখে গলাগলি করে কেঁদে এদেশের মানুষ সামনের দিকে তাকিয়ে অভ্যস্ত। সেটাই আরেকবার হতে পারতাে! এদেশের মানুষের কপাল খারাপ, এরকম দুর্যোগের সময় এরকম এক সরকার ক্ষমতায় বসে আছে। খুব আন্তরিক অন্য কোনাে রাজনৈতিক সরকার থাকলে হয়ত কিছু সান্তনা মিলতাে যে চেষ্টা করা হয়েছে, এই আর কি!

যদি বাংলাদেশ স্বপ্নের মতাে বদলে যেতাে; দেশপ্রেমিক বীর জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতাে যােগ্য সন্তানেরা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকতেন, তবে অনেক কিছুই হতে পারতাে। এমনকি, আজ এই মুহুর্তে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে পূর্ণ ম্যান্ডেট দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হােক, ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়” কবিতা আরাে একবার লেখা হবে।

তবে, এই জাতি অতাে যােগ্য লােকদের শাসন পেতে নিজেরা প্রস্তুত কি না, চেয়েছে কি না, সেটাওতাে দেখতে হবে। এই সময়ে এই পরিস্থিতিতে এই আতঙ্কবাদীদের মতলবটি কী? মতলব সম্ভবত এই যে, লােকজন যেনাে ওলা বিবির মতাে কোনাে জুজুর ভয়েই তটস্থ থাকে, ঘর থেকেই বের না হয়। নির্লজ্জ স্বার্থপর মিডল ক্লাস অনলাইনে টুকটাক সমালােচনা করে করুক, সময় মতাে দুয়েকটাকে কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে গেলেই পুরাে মিডল ক্লাসের পাল ঠিক ঠিক চুপ মেরে যাবে। মহামারীতে যে মৃত্যুর ঘটনাগুলাে ঘটবে, অব্যাবস্থাপনার ফলে নাগরিকেরা যে দুর্ভিক্ষ মােকাবেলা করবে, সেসবে যেনাে কোনাে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা না দেয়, | সেই লক্ষ্যেই কী এরা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে?

ক্ষুধার্ত মানুষ মৃত্যুভয় কাটিয়ে ফেলা | সহজ, যদি সেরকম কিছু ঘটে যায়, | তবে তারাতাে অদম্য হয়ে উঠবে সেক্ষেত্রে গণেশ উলটে যাওয়া কিন্তু মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র।

এরা “আতঙ্ক” না ছড়িয়ে, “তথ্য” প্রচার করে না কেনাে? ব্যক্তি পর্যায়ে এখন সবার করণীয় কী? কোয়ারেন্টাইন কা’র প্রয়ােজন? কোয়ারেন্টাইন মানে কী? কীভাবে সেই সময়টুকু কাটাতে হবে? আইসােলেশন কাদের জন্যে প্রয়ােজন হবে? তারা সেই সময় কীভাবে কাটাবেন? – এসব তথ্য চালাচালি হচ্ছে কি? না হচ্ছে না। কারণ, এসব খুব সাধারন ব্যাপার, জানলে মানা সহজ! সহজ জিনিসটাকেতাে কেউ ভয় পাবেন

, ফলে করােনা আতঙ্ক বলে কিছু থাকবে না। একারণে, আতঙ্কবাদীরা এসব নিয়ে আলােচনা করে না। ফেইসবুকে অনেকের লেখা পড়ে হাসি, এরা মনে করে বসে আছে যে, ঘরের বাইরে গেলেই করােনা পেয়ে বসবে, এরা মনে করে, মাস্ক পরতেই হবে, না পরলে নিজে আক্রান্ত হবে এবং অন্যকে আক্রান্ত করা হবে! হায়! শাসন নির্বিঘ্ন করার সর্বোক্তৃষ্ট উপায় হলাে, শাসিতদেরকে অজ্ঞ করে রাখা; অজ্ঞা ভীরু হবে, ভীরুরা প্রতিবাদী হয়ে উঠবে না।

করােনার ছােবলে ক্ষয়ক্ষতি মাত্র শুরু, সামনে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বাড়বে, তার আগেই যে হৃদয়হীন আচরণ দেখা যাচ্ছে, তা মর্মান্তিক। যাদের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে-হচ্ছে, সেই ভীতি সঞ্চারকারীদেরকে, ফিয়ার মঙ্গারারদেরকে অভিশাপ দিচ্ছি। হ্যাঁ, অসহায়ের প্রতিশােধ, অভিশাপ দিচ্ছি।

আজ এখানে দাড়িয়ে এই রক্ত গােধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি। আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলাে সেঁটে, মগজের কোষে কোষে যারা পুতেছিলাে আমাদেরই আপনজনের লাশ দগ্ধ, রক্তাপ্লাত, যারা আতঙ্ক ছড়িয়েছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু সেই সব পশুদের।

লেখকঃ মুনতাকিম চৌধুরী