ইংল্যান্ডে একটি আযিমুশ্বান ইজতিমার কারগুযারী

লন্ডনস্থিত ডিউজবেরী মারকাযের যিম্মাদার সাথি মাওলানা মারগুব আহমদ লাজপুরী ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি ইজতিমার কারগুযারী এভাবে তুলে ধরেছেনঃ- প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই একটি খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, এবার লন্ডনে তাবলীগ জামাআতের বিশ্ব ইজতিমা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পাক-ভারতের মুরব্বিয়ানে কেরাম তাতে অংশ গ্রহণ করবেন। ইজতিমা যে হবে সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেলাম। কিন্তু নিযামুদ্দীনের মুরব্বীগণ বিশেষ করে হযরতজী মাওলানা এনামুল হাসান সাহেব তাতে অংশ নেবেন এ ব্যাপারে তখনও শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না । কিন্তু যখন নির্ভরযােগ্য সূত্রে একের পর এক সংবাদ আসতে লাগল তখন তার অবিশ্বাসের কোন কারণ থাকল না। কিন্তু একথা চিন্তা করে বিস্মিত হলাম যে, হযরতজী এই বৃদ্ধ বয়সে রােগ-শােকে জর্জরিত অবস্থায় যেভাবে দেশ বিদেশের সফর করে বেড়াচ্ছেন তা উম্মতের জন্য তার ব্যাথা আর দরদেরই প্রমাণ বহন করে। আর একথা চিন্তা করে খুশিও হলাম যে, আমাদের মত হাজার হাজার মানুষ এই দূরদেশে বসেও হযরতজীর যিয়ারতে ধন্য হতে পারব। যাই হােক ইজতিমার অপেক্ষায় মাস গুনতে গুনতে সপ্তাহে এসে ঠেকল। আবার সপ্তাহ গুনতে গুনতে কয়েকদিনই মাত্র বাকি রয়ে গেল। ইজতিমার আগের দিন নিযামুদ্দীনের মুরব্বীরা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করলেন। কাষ্টমস আর ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে তারা। বাইরে বের হয়ে এলেন তখন সেখানে হাজারাে মানুষ জমা ছিল কিন্তু ছিল না। কোন শােরগােল, হৈ হাংগামা, ছিল না যিন্দাবাদ আর মুরাদাবাদের কোন শ্লেগান । বরং চারিদিকে অত্যন্ত শান্ত-গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল। উপস্থিত লােকদের চেহারায় ছিল উফুল্লতা, ঠোটে ছিল মৃদু হাসি আর অন্ত র ছিল উম্মতের ব্যথায় ব্যথিত। সামান্য সময়ে মুসাফাহা, মুআনাকা আর দুআ শেষ হল। যার মধ্যে ছিল অশ্রু বিগলিত চোখ, দরদভরা ঠান্ডা নিঃশ্বাস আর ব্যথিত দিল । সেটা একটা আজীৰ দৃশ্য ছিল যা নিজেদেরকে এবং অন্যদেরকে তাওহীদবাদী এবং তিন খােদার পুজারীদেরকে সত্যের দিকে আহবান করছিল।

এয়ারপাের্ট থেকে মুরব্বীদের এই জামাআত ডিউজবেরী পৌঁছল যেখানে ইজতিমার ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করা হয়েছিল । এটা ছিল বুধবারের ঘটনা, পরের দিন বৃহঃবার সন্ধা থেকে ইজতিমা শুরু হওয়ার প্রােগ্রাম ছিল । কিন্তু বৃহঃবার সকাল থেকেই ডিউজবেরীর অলিতে গলিতে মানুষের ঢল চোখে পড়তে লাগল । ডিউজবেরীর দুটি প্রশস্ত ময়দানে বিশাল শামিয়ানার নীচে ইজতিমার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্যান্ডেলের ভিতরেও বিভিন্ন ভাষায় তরজমার জন্য ছােট ছােট কিছু খেত্তা বানানাে হয়েছিল। বিশাল এই প্যান্ডেলের নীচে আসরের নামায অনুষ্ঠিত হল । নামাযের পরে ইজতিমার কার্যক্রম শুরু হল। যেখানে না ছিল কোন সভাপতি না ছিল কোন এস্তেকবালিয়া কমিটি। কিন্তু তারপরেও সমস্ত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুচারুরূপে। সম্পন্ন হচ্ছিল।

প্রথম দিন আসরের পরে হযরত মাওলানা উমর পালনপুরী সাহেবের বয়ান হল। হযরত মাওলানা তার নিজস্ব বিশেষ ভঙ্গিতে তাওহীদ এবং দাওয়াতের উপর প্রায় দেড় ঘন্টা বয়ান করলেন। বয়ানের ভেতর তার কুরআনের আয়াতের তেলাওয়াত শ্রোতাদেরকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। মাগরিবের আগেই তাশকীলের মাধ্যমে বয়ান শেষ হয়ে গেল। আসরের সময় প্যান্ডেলের ভেতর অর্ধেক ভরেছিল কিন্তু মাগরিবের সময় দেখা গেল প্যান্ডেল একেবারে ভর্তি। ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষের ভীড় ঘন্টায় ঘন্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

মাগরিবের নামায শেষ করে খানা এবং তারপর ইশার নামায পড়ার প্রােগ্রাম ছিল। কেননা ইংল্যান্ডে তখন রাত খুবই ছােট। রাত ১১টায় ইশার নামায পড়ে ৪টা বেজে দশ মিনিটে ফজরের ওয়াক্ত হচ্ছিল। তাই কয়েক ঘন্টা আরাম করার পরে ফজরের নামায আদায় করা হল। ফজরের পরে পাকিস্তানের তাবলীগ জামাআতের আমীর আলহাজ আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের বয়ান হল । হযরতের। বয়ান অত্যন্ত সাদাসিদা এবং তাবলীগের ফিকিরে ভরপুর ছিল। বয়ান শেষে দশটা পর্যন্ত বিরতি দেয়া হল। বারটার সময় দুপুরের খানা হল আর আড়াইটার সময় মাওলানা যুবাইরুল হাসান সাহেব জুমুআর নামায পড়ালেন। আসরের পরে জামেআ ডাভেলের বিশিষ্ট আলেম মুফতী যাইনুল আবেদীন সাহেব বয়ান করলেন। তাঁর বয়ানের সময় শ্রোতাদের মধ্যে আজীব এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বয়ানের মধ্যে তিনি বলছিলেন, “একবার কোন এক সফরে আমি একটি হােটেলে উঠলাম । সেখানে এক ব্যক্তি এসে বলতে লাগল, মুফতী সাহেব! আজকের যুগে তাে পুরা দ্বীনের উপর চলা অত্যন্ত। কঠিন। কেননা মনে করুন সুদের কথা, সেটা এমনই ব্যাপকতা লাভ করেছে। যে, তা থেকে বাঁচাই মুশকিল। আমি বললাম, দুনিয়াতে কঠিন কিছু নেই। তবে মানুষ যে দরজা অবলম্বন করে সেটাই তার জন্য খােলে। অনুরূপভাবে। কেউ যদি হারাম পথে কামাই করার ইচ্ছা করে তাহলে তার জন্য সেই দরজাই খুলবে। আর কেউ যদি হালাল কামাইয়ের নিয়ত করে তাহলে তার জন্য উক্ত রাস্তা সহজ হয়ে যাবে।” মাগরিবের আগে বয়ান শেষ হল, তারপর খানা এবং এশার নামায । শনিবারে ফজরের পরে হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের বয়ান হল । যােহরের পরে সাঈদ আহমদ খান সাহেবের এবং আসরের পরে মাওলানা উমর পালনপুরীর (রহঃ) বয়ান হল। মাগরিবের আগে হযরতজী সংক্ষিপ্ত বয়ান করে বিবাহের খােতবা পড়ালেন আর মাওলানা যুবায়ের সাহেব ঈজাব কবুল করালেন। প্রায় ১০০টি বিবাহ সম্পন্ন হল। রবিবার ফজরের পরে এক নওজোয়ান আলেমেদ্বীন, আশ্চৰ্য্য তার স্বরণশক্তি আর বাচনভঙ্গি। নাম মাওলানা তারেক জামীল, তিনি বয়ান করলেন। আল্লাহ তাআলা জনাবকে আশ্চৰ্য্য স্বরণশক্তি দান করেছেন। মুনকিরীনে হাদীস যারা মুহাদ্দিসীনদের স্বরণ শক্তির কথা হেসে উড়িয়ে দেয় তারা এই যুগে মাওলানা তারেক জামীল সাহেবকে দেখে নিতে পারেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমস্ত কথা ও কাজকে নাজাতের মাধ্যম মনে করতেন, তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে, তারা সেসব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবেন না। অথচ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দিয়েছিলেন অসাধারণ। মেধা আর স্বরণশক্তি। মাওলানা তারেক জামীল সাহেবের লম্বা লম্বা হাদীস মুখস্থ। কোথাও বাধে না, তার বর্ণনা শুনলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতে হয় । সকাল ১১ টায় মুফতী যাইনুল আবেদীন সাহেব উলামাদের উদ্দেশ্যে বয়ান রাখলেন। জোহরের পরে আখেরী বয়ান এবং হেদায়াতী কথা বলার জন্য মাওলানা উমর পালনপুরী সাহেব মিম্বরে তাশরীফ আনলেন। বয়ানের পরে আখেরী মুনাজাত হওয়ার কথা ছিল। তখন প্যান্ডেলের এমন অবস্থা যে, চারিদিকে দূর দূরান্ত পর্যন্ত শুধু মানুষ আর মানুষ । হযরত মাওলানা দুই ঘন্টা বয়ান করলেন তারপর হযরতজী মাওলানা এনামুল হাসান সাহেব তাশরীফ আনলেন। তিনি হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) এর ছাত্র এবং খলীফা। ইলম ও আমলে আকাবেরদের জ্বলন্ত নমুনা। তিনি ফারেগ হওয়ার পরে দরস ও তাদরীসের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন এবং বিভিন্ন ফনের কিতাব পড়িয়েছেন। বছরের পর বছর হাদীসের দরস দিয়েছেন। কয়েক বছর বুখারী শরীফও পড়িয়েছেন। তিনি বিশ মিনিট দুআ করলেন। দুআর সময় হাজেরীনদের যে অবস্থা দাঁড়াল তা বর্ণনাতীত। হযরতের উপরও যে কায়ফিয়ত বিরাজ করছিল তা বলার মত না। দুআর শব্দগুলাে অনেক কষ্টে বের হচ্ছিল। এভাবেই এই বরকতময় ইজতিমা শেষ হল। ধারণা করা হয়। যে, ইজতিমায় উপস্থিতির সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ হাজার ছিল । তিন দিন পর্যন্ত ডিউজবেরীতে বড় শান শওকতের দৃশ্য বিরাজ করছিল। আযানের আওয়াজ আর রাস্তা পর্যন্ত প্রলম্বিত নামাযের কাতার বড় মনােলােভা ছিল । এই ইজতিমার একটি বৈশিষ্ট এই ছিল যে, মানুষের উপস্থিতিতে এটি একটি জলসার তুলনায় একটি খানকার আকৃতি ধারণ করেছিল। দিনের কর্মক্লান্ত মানুষ রাতে সন্নাসী হয়ে যেত। চারিদিকে নামায, তেলাওয়াত, যিকির আর দুআয় কান্নার রােল পরিবেশকে আরাে প্রাণবন্ত করে তুলত। ইজতিমায় আম-খাস সব ধরনের লােকই শরীক ছিল। ৪৪টি দেশ থেকে লােকজন এতে শরীক হয়েছিল। বিভিন্ন রং, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন চেহারাসুরত, হানাফী, মালেকী, হাম্বলীর এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল। এই ইজতিমা থেকে ৪০০টি জামাআত আল্লাহর রাস্তায় বের হল। ৭০ টি দেশে এই জামাআতগুলাে পাঠানাে হল। এর মধ্যে ১৩০টি জামাআত ছিল শুধুমাত্র আরবদের।