আহা! মেয়েরা যদি এমন হতাে!

আহা! মেয়েরা যদি এমন হতাে!

কচকচে কালাে এক ব্যক্তি। নাম সা’আদুল আসাদ। সীমাহীন পর্যায়ের বদসূরত তার চেহারা। কৃষ্ণ-কালাে দেহ ও মুখের এই বদ আকৃতির কারণে সবাই তাকে ঘৃণা করে, নাক সিটকায়। ফলে জীবনের ব্যাপারে চরম নৈরাশ্যে ভুগছেন তিনি। ভাবছেন, এ জীবন একেবারেই অর্থহীন, নিরর্থক।। | যাহােক, হতাশা-নিরাশার এক পর্যায়ে তিনি দয়ার সাগর রাহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। বললেন- “হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ঈমান আনতে চাই; কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে যে, (এই বদ আকৃতির ফলে) আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেয়া হবে কি-না।’ | একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সীমাহীন স্নেহ ও সহমর্মিতার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। অতঃপর দরদভরা কণ্ঠে বললেন- “হে সাআদ! জান্নাতের দরজা তােমার জন্য উন্মুক্ত। সেখানকার প্রবেশ পথে তােমাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই।”

“তাই না কি! আমি জান্নাতে যেতে পারবাে!! জান্নাতের প্রবেশদ্বারে কেউ আমাকে বাধা দিবে না!!! – অপরিসীম বিস্ময় ও আনন্দের সঙ্গে তিনি এ কথাগুলাে উচ্চারণ করলেন এবং সাথে সাথে বুলন্দ আওয়াজে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলেন।

এর কিছুদিন পরের ঘটনা । হযরত সাআদ (রাঃ) আরাে অভিযােগ নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন। দ্বিতীয়বারের মত তার চোখ-মুখ থেকে নৈরাশ্য ঝড়ে পড়ছিল । | তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! ইসলাম তাে আমার সাথে জান্নাতের ওয়াদা করেছে সত্য; কিন্তু দুনিয়া যে আমাকে ধিক্কার দিচ্ছে । আমি বিবাহ করতে চাচ্ছি; কিন্তু আমার বদসূরতের কারণে কেউ আমার সাথে আপন মেয়েকে বিবাহ বনে আবদ্ধ করতে রাজী হচ্ছে না।”

বল কী তুমি! কেউ তােমাকে পছন্দ করছে না! যাও, সাকীফ গােত্রের নওমুসলিম সর্দার আমর ইবনে ওয়াহাবকে আল্লাহর রাসূলের ফায়সালা শুনিয়ে দাও যে, তার মেয়েকে সাআদের সাথে বিবাহ দেয়া হয়েছে।” | রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে কথাগুলাে শ্রবণ করে হযরত সা’আদ (রাঃ) সীমাহীন বিস্মিত হলেন। ভাবলেন, এটা কি করে সম্ভব! যার নিকট একজন সাধারণ লােকও স্বীয় কন্যাকে বিবাহ দিতে রাজী হচ্ছে না সেখানে কি করে একজন সম্ভ্রান্ত বংশের সম্মানিত সর্দার তার আদরের দুলালীকে বিবাহ দিবে! |

কিন্তু হযরত সা’আদ (রাঃ) স্বীয় জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগলেও আল্লাহর রাসূলের কথার প্রতি তাঁর পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। তাই অন্য কোন চিন্তা না করে তৎক্ষণাত তিনি গােত্রপতি আমর ইবনে ওয়াহাবের নিকট পৌঁছলেন এবং রাসূলের কথাগুলাে তাকে শুনিয়ে দিলেন।

হযরত সা’আদ (রাঃ)-এর কথাগুলাে শুনে গােত্রপতি রাগে-গােস্বায় অস্থির হয়ে পড়লেন। সীমাহীন পর্যায়ের কালাে-কুৎসিত বদসূরত এক ব্যক্তির সাথে তার অপরূপ সুন্দরী ষােড়শী কন্যার বিবাহের কথা কল্পনা করে তিনি একথা ভাবতেও ভুলে গেলেন যে, বিবাহের এ প্রস্তাবের মূলে রয়েছেন দু’জাহানের সর্দার, জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।

হযরত সা’আদ (রাঃ)-গােত্রপতি আমর ইবনে ওয়াহাবের অবস্থা লক্ষ্য করে নিরাশ হয়ে ফিরে চললেন। কিন্তু ২/৪ কদম সামনে এগুতেই তার কর্ণকুহরে নারী কণ্ঠের একটি সুমিষ্ট আওয়াজ ভেসে এল

“হে আগন্তুক ! হে আল্লাহর বান্দা! এ প্রস্তাব যদি আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে আমি রাজী ।” | হযরত সা’আদ আওয়াজ শুনে থমকে দাড়ালেন। | এদিকে মেয়ের মুখ থেকে আল্লাহর রাসূলের নাম শুনে আমর ইবনে এয়াহাবের রাগ বরফের ন্যায় শীতল হয়ে গেল। তার হুশ ফিরে এলাে। অতঃপর স্বীয় ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত আদর ও সম্মানের সাথে হযরত । সা’আদ (রাঃ) কে বরণ করে নিলেন এবং তাঁর সাথে আপন মেয়ের বিবাহ পড়িয়ে দিলেন । | এবার হযরত সা’আদ (রাঃ) সামান্য আনুষ্ঠানিকতার সামানাদি খরিদ করার জন্য বাজারে চললেন । হৃদয়-মনে তার আনন্দের ঝড় বইছে। নববধূকে নিয়ে নতুন নীড় রচনার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে একটু দ্রুত পদেই বাজারের দিকে এগুচ্ছেন তিনি।

কিন্তু হঠাৎ এক আহবানকারীর আহবান শুনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।

“হে আল্লাহর বান্দাগণ! যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। বেদ্বীন কাফেরদের সাথে তােমাদের জিহাদ করতে হবে। তােমরা সবাই প্রস্তুত হয়ে যাও।”

একটু পূর্বেও যিনি বাসর রাতের সুখ-স্বপ্নে ছিলেন বিভাের তিনি আহবান শুনে জেহাদের ময়দানে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করার জন্য পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তার মন বারবার তাকে একথাই বলছিল যে, ব্যক্তিগত আরাম আয়েশ ও আনন্দ উল্লাসের চেয়ে আল্লাহ পাকের একমাত্র মনােনীত ধর্ম ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য জান-মাল উৎসর্গ করা অনেক শ্রেয়। তাইতাে তিনি কাল বিলম্ব না করে বিবাহের সামানাদি খরিদ করার পরিবর্তে যুদ্ধের ঢাল-তলােয়ার ক্রয় করে জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়লেন। | হযরত সা’আদ (রাঃ) সুন্দর পাগড়ী মাথায় জানপ্রাণ দিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করে চলছেন। কেউ তাকে চিনতে পারছে না। হঠাৎ তার হাত দুটো দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনে _ ফেললেন । স্নেহভরে পিছন থেকে ডাক দিলেন- সা’আদ! সা’আদ!! কিন্ত শাহাদতের অমীয় সুধা পান করার চরম আকাংখায় তুমুল লড়াইয়ে লিপ্ত , হযরত সা’আদের কর্ণকুহুরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৌঁছল না। এভাবে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। | যুদ্ধ শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আবেগের। সাথে হযরত সা’আদের প্রাণহীন লাশ স্বীয় রান মােবারকের উপর রাখলেন এবং বললেন, হে সাকীফ গােত্র! আল্লাহ তায়ালা সা’আদকে সাকীফ গােত্রের মেয়ে অপেক্ষা অধিক সুন্দরী স্ত্রী দান করেছেন।

উল্লেখিত ঘটনা থেকে আমরা দুটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে নিজের পছন্দ, নিজের কল্পনা, নিজের স্বপ্ন, নিজের মতামত নিজের ইচ্ছা-আবেগ এক কথায় নিজস্ব সব কিছুর উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচ্ছা ও মাসাকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন প্রাধান্য দিয়েছিলেন গােত্রপতি আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাবের কন্যা। কেননা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকটা মেয়ে এমন একজন পুরুষকে জীবন। সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করে যার আকার আকৃতি ও চেহারা সূরত হবে অতুলনীয়; যার স্বাস্থ্য হবে সুন্দর-সুঠাম । কিন্তু উক্ত মেয়েটি নিজস্ব সকল ইচ্ছা এবং আকাংখার উর্ধ্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাইতাে তার মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এসেছে “হে আগন্তুক! এ প্রস্তাব যদি আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে আমি প্রস্তুত আছি।”

বস্তুতঃ উক্ত মহিয়সী মহিলা এ কথার মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমগ্র নারীজাতিকে একথাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, হে বিশ্বের মহিলা জাতি! তােমরা সর্বদা সকল ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা ও আকাঙখার উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা ও আকাংখাকে প্রাধান্য দিও। এতেই তােমাদের কল্যাণ হবে।”

সুতরাং সমস্ত মহিলা যদি উক্ত ঘটনা পাঠ করে আজ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে কোন বাণী, চাই তা আমাদের বুঝে আসুক বা না আসুক; বাহ্যতঃ আমাদের পক্ষে হউক কিংবা বিপক্ষে হউক তার উপর আমরা অবশ্যই আমল করব। তাহলে কতােই না ভাল হত!

এ কথাগুলাে বলার দ্বারা অধম লেখকের উদ্দেশ্যে হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে বিদ্যমান একটি ভুল ধারণার নিরসন করা। কেননা অধিকাংশ মহিলা গভীরভাবে চিন্তা না করার কারণে মনে করে যে, হাদীছ শরীফে স্ত্রীর তুলনায় পুরুষের হক অনেক বেশী বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, স্বামীর কথামত চলা, তাদের খেদমত করা, তাদেরকে খুশি রাখার চেষ্টা করা ইত্যাদির ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীছে বার বার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু অনেক মহিলাদের মন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথাগুলােকে মেনে নিতে পারছে না। তারা মনে করে স্বামীরাও মানুষ আমরাও মানুষ, সুতরাং তাদের হক আমাদের হকের চেয়ে বেশী হবে কেন? (নাউযুবিল্লাহ)। | প্রকৃতপক্ষে মেয়েরা তাদের স্বল্পবুদ্ধির কারণেই এরূপ অমূলক ধারণা পােষণ করে থাকে। তারা একথা মােটেও চিন্তা করে না যে, এ নির্দেশ তাে কোন সাধারণ মানুষের নয়; বরং এই নির্দেশ এসেছে নারী-পুরুষ উভয়ের নবী, দয়ার সাগর রাহমাতুল্লিল আলামীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে। সুতরাং এত বড় দরদী নবী যখন স্বামীর খেদমত করার কথা বলেছেন শরীয়ত সম্মত তার যাবতীয় নির্দেশ বিনা। বাক্য ব্যয়ে সাথে সাথে পালন করার কথা বলেছেন, সুতরাং নিশ্চয়ই এতে আমাদের কল্যাণ আছে, এতেই আমাদের সফলতা আছে, এতেই আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি আছে। | সুতরাং আসুন! আজ থেকে আমরা নিজের মন থেকে এ ভুল ধারণাকে | সমূলে উৎখাত করি এবং বারবার বলতে থাকি- “স্বামীর খেদমত এবং

তাদের কথামত চলার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ, পারিবারিক শান্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি নিহিত আছে।”

উক্ত ঘটনার ২য় শিক্ষনীয় দিক হচ্ছে ইসলাম ধর্মকে দুনিয়াতে টিকিয়ে রাখতে এবং এর প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে যে কোন ধরণের কোরবানীর প্রয়ােজন হলে তার জন্য সব সময় তৈরী থাকতে হবে। আলাহ আমাদের তৌফিক দিন।